মধ্যপ্রাচ্যের ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী দেশ সিরিয়া। টানা ১৪ বছর ধরে চলা যুদ্ধে দেশটির অধিকাংশই প্রায় বিধ্বস্ত। এখন দেশটির প্রশাসন নতুনভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করছে। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে ইসরায়েলের সঙ্গে কী ঘটতে পারে, সেই দিকটায়।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে কিছু আলোচনা হয়েছে। এমনকি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে একটি সময়রেখাও আলোচনায় এসেছে। যদিও ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে।

এখন পর্যন্ত কী কী ঘটেছে
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়েছে। আলোচনার বিষয় ছিল দুই দেশের মধ্যে একটি সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ চুক্তি করা সম্ভব কি না।
এই যোগাযোগের একটি গোপন পথ তৈরি করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তারাই দুই দেশের মধ্যে কথাবার্তা চালানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
চুক্তি হলে সেটি সম্ভবত ‘আব্রাহাম চুক্তি’র একটি সম্প্রসারণ হবে। চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কিছু আরব রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে হয়েছিল।
আব্রাহাম চুক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি শীর্ষ-নির্দেশনা ভিত্তিক উদ্যোগ। তার লক্ষ্য ছিল আরব দেশগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করানো।
২০২০ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে সুদান ও মরক্কোও এতে যোগ দেয়। এরপর থেকে ট্রাম্প এই চুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছেন। তিনি আরও দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তিতে আনতে চেয়েছেন।
ট্রাম্প গত মে মাসে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশ সফর করেন। ওই সফরে তিনি সৌদি আরবে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানেই তিনি সিরিয়াকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আহ্বান জানান।

সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া কি সম্ভব
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে হয়তো এমনটি সম্ভব হতে পারে। তবে বর্তমানে এটি প্রায় অসম্ভব।
সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই শত্রুতাপূর্ণ। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় এই শত্রুতা আরও বেড়ে যায়। সেই সময় ইসরায়েল সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিডিওন সার জানিয়েছেন, সিরিয়ার সঙ্গে কোনও চুক্তি হলেও ইসরায়েল গোলান মালভূমির দখল ছাড়বে না। বরং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও গভীরে প্রবেশ করেছে এবং সেখানকার ঘরবাড়ি দখল করে মানুষকে সেখান থেকে বের করে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক সিরিয়ান গোলান মালভূমি ইসরায়েলকে ছেড়ে দেওয়ার বিপক্ষে। তবে বাস্তবমুখী আলোচনা হলে সাধারণ মানুষ হয়তো সেটিকে ইতিবাচকভাবে নেবে।
লেখক রবিন ইয়াসিন-কাসাব বলেন, “সিরিয়াবাসী দ্বিধায় আছে। একদিকে তারা ক্লান্ত। সবাই বুঝতে পারছে সিরিয়া নিজেকে রক্ষা করতে বা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জিততে পারবে না। তাই প্রেসিডেন্ট আল-শারার যদি আলোচনায় বসেন, সেটা ভালো।”
তিনি আরও বলেন, ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতির মতো কোনও চুক্তি ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ দেশ ছেড়ে পালানোর এক সপ্তাহ পর ইসরায়েলি সংসদ সিরিয়ায় বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা অনুমোদন করে। এই বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ। বর্তমানে দখলকৃত গোলান মালভূমিতে ৩১ হাজারের বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী রয়েছে।
সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আল-শারার বলেছেন, সিরিয়া শান্তির জন্য প্রস্তুত। তিনি ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলার আশ্বাসও দিয়েছেন। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত ৮ ডিসেম্বর আসাদের সিরিয়া ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার দিন ঘোষণা করেন তিনি ওই চুক্তিকে বাতিল হিসেবে বিবেচনা করেন।
এই সময়ের মধ্যে ইসরায়েল বহুবার সিরিয়ায় হামলা চালিয়েছে। এতে সিরিয়ার সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে এবং দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চল ইসরায়েলের দখলে চলে গেছে।
এখন সিরিয়া চাইছে, একটি নতুন অনাক্রমণ চুক্তির আওতায় ইসরায়েল যেন এই নতুনভাবে দখলকৃত অঞ্চল থেকে সরে দাঁড়ায়। যদিও প্রতিবেদনগুলো বলছে, গোলান মালভূমি নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও আলোচনা হয়নি।

সম্প্রতি কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে
সাম্প্রতিক সময়ের খবরে জানা গেছে, ইসরায়েল সিরিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বারবার যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাককে এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে অনুরোধ করেছেন।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান জাচি হানেগবি এই আলোচনার তদারকি করছেন বলে জানা গেছে। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত রয়েছেন। ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দ্য টাইমস অব ইসরায়েলকে জানিয়েছেন, এই আলোচনা এখন “উন্নত পর্যায়ে” রয়েছে।
লেবাননের সংবাদপত্র আল-আখবার জানিয়েছে, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আল-শারার ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যক্তি চাইছেন ইসরায়েল যেন আগ্রাসন বন্ধ করে।
সিরিয়া এই আলোচনায় কী চায়
সিরিয়া চাইছে, ইসরায়েল যেন সিরিয়ার ভূখণ্ডে হামলা বন্ধ করে।
অনেক সিরিয়ানই ইসরায়েলের গোলান মালভূমি দখল ও সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে আল-শারার সরকার দখলকৃত অঞ্চল ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জোর দাবি জানাবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
তবে সিরিয়া চায়, ইসরায়েল যেন গোলান মালভূমির মূল অংশ থেকে এবং গত এক বছরে নতুনভাবে দখল করা অঞ্চলগুলো থেকেও সরে যায়।
ইসরায়েল নতুন সিরিয়ান সরকারকে হুমকি দিয়েছে, যেন তারা দামেস্কের দক্ষিণাঞ্চলে সৈন্য মোতায়েন না করে। এই অঞ্চলটি ইসরায়েল সীমান্তের কাছেই অবস্থিত।
ইসরায়েল ওই অঞ্চলে গোষ্ঠীগত বিভাজন উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তারা বলেছে, নতুন সিরিয়ান সরকারের অনুগত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে দেশটির সংখ্যালঘু দ্রুজ সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তারা “সিরিয়ান দ্রুজদের রক্ষা করতে” হস্তক্ষেপ করবে।
দ্রুজ সম্প্রদায়ের অনেকেই সিরিয়ার নতুন সরকারকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তবু ইসরায়েলের এই হস্তক্ষেপের হুমকিকে অনেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাটক বলে নিন্দা করেছে। তাদের মতে, এই হুমকির লক্ষ্য হচ্ছে সিরিয়ানদের মধ্যে আরও বিভেদ তৈরি করা।

ইসরায়েল কী চায়
প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু চাইছেন, ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতির চুক্তিকে হালনাগাদ করে একটি নতুন নিরাপত্তা চুক্তি করা হোক। এর ভিত্তিতে তিনি সিরিয়ার সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করতে চান।
যুক্তরাষ্ট্রের দূত ব্যারাক অ্যাক্সিয়োসকে বলেন, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে বিরোধ “সমাধানযোগ্য”। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, শুরুটা করা যেতে পারে একটি “অনাক্রমণ চুক্তি” দিয়ে। তবে গোলান মালভূমির দখল অব্যাহত থাকলে অনেক সিরিয়ান ক্ষুব্ধ হতে পারেন।
লেখক রবিন ইয়াসিন-কাসাব বলেন, “এটা (চুক্তি) রাজনৈতিকভাবে আল-শারার জন্য খুব কঠিন হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র চাপ বা ইসরায়েল সহিংসতার হুমকি দিলেও তা সহজ হবে না।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েল এই চুক্তির জন্য অতিরিক্ত কিছু শর্ত দিচ্ছে। যেমন—সিরিয়ায় কোনও তুর্কি সামরিক ঘাঁটি থাকতে পারবে না, ইরান বা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী যেমন হিজবুল্লাহর উপস্থিতিও মেনে নেওয়া যাবে না। পাশাপাশি দক্ষিণ সিরিয়াকে সামরিকীকরণমুক্ত রাখতে হবে।
তথ্যসূত্র : আল জাজিরা


