বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত ২৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
এছাড়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৩০ জনের মধ্যে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার চারজনকে এই মামলায় সোমবার গ্রেপ্তার দেখিয়ে আগামী ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে একই তারিখে অগ্রগতি প্রতিবেদনও দিতে বলেছে আদালত।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকার নেওয়ার পর পুনর্গঠিত তদন্ত সংস্থা তদন্ত শুরু করে।
প্রথম আলো জানিয়েছে, আবু সাঈদ হত্যা মামলায় রবিবার যে ২৬ জনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে তাদের মধ্যে বেরোবির সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদ রয়েছেন।
বাসস জানিয়েছে, আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে সোমবার সকালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি রেজিস্ট্রার বরাবর জমা দেওয়ার পর তা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
এরপর বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আবু সাঈদ হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি আমলে নিয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য ১০ জুলাই দিন ধার্য করেন। প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম শুনানি করেন। এসময় অন্য প্রসিকিউটররা ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “তদন্ত সংস্থা আবু সাঈদ হত্যার যে তদন্ত আমাদের কাছে জমা দিয়েছে সেখানে ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনটি যাচাই-বাছাই করে ট্রাইব্যুনাল-২ এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফর্মাল চার্জ) হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।”
এই মামলার আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত চার আসামির মধ্যে পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে ১৮ জুন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী আকাশকে ১৯ জুন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল-১।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন যখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন ১৬ জুলাই দুপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে গুলিবিদ্ধ হন আবু সাঈদ। ২৫ বছর বয়সী আবু সাঈদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নিরস্ত্র আবু সাঈদের পুলিশের ছোড়া গুলিতে বিদ্ধ হওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদেই সোচ্চার হয় বহু মানুষ, যাতে আরও গতিশীল হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
এই অভ্যুত্থান দমনে আওয়ামী লীগ সরকার ৮৩৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল বলে গত জানুয়ারিতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক গেজেটে হিসাব দেওয়া হয়। তবে সংখ্যাটি আরও বেশি বলে দাবি করছেন অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা।
গত ১ জুন শেখ হাসিনাকে জুলাই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসাবে চিহ্নিত করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। শুনানি শেষে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল সেই অভিযোগপত্র আমলে নেয়।
অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনার আসামি করা হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে।
এরমধ্যে আসাদুজ্জামান কামাল বিদেশে পালিয়ে গেলেও সাবেক আইজিপি আল-মামুন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।
তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে জুলাই হত্যাকাণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার’ উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাই হত্যাকাণ্ড ছাড়াও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে একটি আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে গুম-খুনের ঘটনার নিয়ে; অন্যটি ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকন্দ্রিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে। তার মধ্যে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার আগে শুরু হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারকে গত ডিসেম্বরেই চিঠি দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে তার জবাব মেলেনি। এদিকে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গণহত্যার দায়ে দলটির বিচারের দাবিও রয়েছে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের।



