Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

বরগুনার ডেঙ্গু পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের, দেখাল আইইডিসিআরের জরিপ

বরগুনা হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড
বরগুনা হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড
[publishpress_authors_box]

চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত জানুয়ারিতে বরগুনায় রোগী ছিল ৩৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৪, মার্চে ১২ আর এপ্রিলে ১৬৫ জন। এরপর থেকেই সেখানে বাড়তে শুরু করে রোগী সংখ্যা। মে মাসে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৬৪ জনে আর চলতি জুনের এখন পর্যন্ত রোগী পাওয়া গেছে এক হাজার ৩০৯ জন।

এইডিস মশাবাহিত এই রোগটি ঢাকা ছাড়িয়ে সারাদেশের রোগ হয়ে উঠেছে বিগত কয়েক বছরে। তাই বলে দক্ষিণাঞ্চলের এক জেলাতেই এত বেশি রোগী চিন্তায় ফেলে দেয় জনস্বাস্থ্যবিদদের।

বরগুনায় রোগী বাড়ার পর সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটি দল সেখানে যায়। আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. রত্মা দাসের নেতৃত্বে ৭ জনের দলটি চলতি মাসের ১৬ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত সেখানে গবেষণা চালায়।

গবেষণা শেষে বুধবার আইইডিসিআরের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা হয় বরগুনায় ডেঙ্গুর বর্তমান অবস্থা।

সেখানে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন জানান, বরগুনা সদর এলাকা, পাথরঘাটা এবং বাংনা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। তুলনামূলক কম রোগী পাওয়া গেছে বেতাগি এবং আমতলী এলাকায়।

এর আগে ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ে জরিপ চালালেও বরগুনাতে এবারই প্রথম। আর সেই জরিপে পাওয়া চিত্রটাকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবেই উল্লেখ করেন তিনি।

জরিপের ফলাফল থেকে তিনি জানান, বরগুনার ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে অর্ধেকেরই বেশি অর্থাৎ ৫টি ওয়ার্ডই ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সদর উপজেলায় লার্ভার ঘনত্ব মিলেছে স্বাভাবিকের তুলনায় অন্তত সাড়ে ৮ গুণ বেশি।

ডেঙ্গুসহ বেশ কয়েকটি রোগের বাহক এই মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচককে বলা হয় ‘ব্রুটো ইনডেক্স’। কোনও স্থানে এই ব্রুটো ইনডেক্স ২০ শতাংশের বেশি হলে সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলে মনে করা হয়।

তাহমিনা শিরীন জানান, বরগুনা সদরে ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ১৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা স্বাভাবিকের থেকে ৮গুণ বেশি। আর পৌরসভা এলাকাতে ৪৭ দশমিক ১০ শতাংশ, যা এইডিস মশার উপস্থিতির ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার দ্বিগুণের বেশি। বরগুনার ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে একটি ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স রয়েছে ১৫৩ দশমিক ৩৩, একটিতে ১৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। মাত্র ৪টিতে ব্রুটো ইনডেক্স ২০ এর নিচে।

এর আগে ২০২৪ সালে ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা চিহ্নিত করতে ব্রুটো ইনডেক্স করা হয়। তখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড হিসেবে উঠে আসে ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের নাম। পুরান ঢাকার পোস্তগোলা, গেন্ডারিয়া, লাল মোহন পোদ্দার লেইন, ফরিদাবাদ লেইন, বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনিসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত এই ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া যায় যেখানে ৭০ শতাংশ। ।

ডেঙ্গু সাধারণত চারটি ধরন দিয়ে আক্রান্ত হয়। ডেন ১, ২, ৩ এবং ৪। এই চার ধরনের যে কোনওটি দিয়ে রোগী সংক্রমিত হতে পারে। তবে কেউ যদি একাধিকবার একাধিক সেরোটাইপ দিয়ে আক্রান্ত হয়, তখন তার জটিলতা অনেক বেশি বেড়ে যায়।

জরিপে উঠে এসেছে বরগুনার রোগীরা এবার ডেন ২ এবং ডেন ৩ এর মিশ্র সেরোটাইপ দিয়েও আক্রান্ত হচ্ছে। যদিও আক্রান্ত বেশি হচ্ছে ডেন ৩ ও ডেন ২ সেরোটাইপে।

তাহমিনা শিরীন বলেন, এখানে ডেন ২ দিয়ে আক্রান্ত মানুষের হার ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ, ডেন ৩ দিয়ে আক্রান্ত ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ আর ডেন ২ ও ৩ দিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১৪ শতাংশ মানুষ।

“তবে এসবই হাসপাতালের রোগী সংখ্যা। এর বাইরেও অনেক রোগী রয়েছে, যারা হাসপাতালে আসছে না, চিকিৎসকদের প্রাইভেট চেম্বারে যাচ্ছে।”

জরিপকারীরা পৌর এলাকার ১৩৮টি এবং সদর উপজেলার ৪৬টি বাড়ি পরিদর্শন করে দেখেছে, সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে একক আলাদা বাড়িতে; ৫৬ শতাংশ। এরপর সেমি পাকা বাড়িতে ৩৩ শতাংশ, নির্মাণাধীন বাড়িতে ২ শতাংশ আর মাল্টিস্টোরেড ভবনে ৯ শতাংশ।

বরগুনায় এত তীব্র আকারে এইডিস মশার বিস্তারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাহমিনা শিরীন বলেন, “বরগুনা এলাকায় খাওয়ার পানির সঙ্কট রয়েছে। তাই বিভিন্ন বাড়িতে বৃষ্টির পানি ড্রামসহ নানা পাত্রে ধরে রাখা হয়। পাত্রগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার না করা, দীর্ঘদিন পানি জমিয়ে রাখায় সেখানে মশার লার্ভা জন্মাচ্ছে। এছাড়া মগ, পাত্র, বদনায় মশার লার্ভা বেশি পাওয়া গেছে।”

সমাধান হিসেবে সবার সচেতন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে তিনি বলেন, “বাসার ভেতর মশার লার্ভা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তাই পানি জমতে দেওয়া যাবে না। জমিয়ে রাখা পানির ড্রামের মুখটা বন্ধ করে রাখলে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।”

২৪ ঘণ্টার চিত্র

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত আরও ৩২৬ জন নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে টানা পঞ্চম দিনের মতো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩০০ ছাড়াল। এসময়ে প্রাণ হারিয়েছে ২ জন।

বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৩২৬ জন নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর আগে অধিদপ্তর মঙ্গলবার ৩৯২ জন, সোমবার ৩৯৪ জন, রবিবার ৩২৯ জন, শনিবার ৩৫২ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য জানিয়েছিল।

এ নিয়ে গত মে মাসের তুলনায় চলতি মাসে রোগী সংখ্যা বাড়ল তিনগুণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মে মাসে যেখানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ডেঙ্গু রোগী ছিল এক হাজার ৭৭৩ জন, সেখানে জুনে এখন পর্যন্ত রোগী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫২৫ জনে।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ২ জনের। তাদের নিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যু হলো ৩৬ জনের আর চলতি মাসে মৃত্যু হলো ১৩ জনের।

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় যে ৩২৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তাদের মধ্যে বরিশাল বিভাগের ১১৮ জন। বাকীদের মধ্যে চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে ৪৩ জন করে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২৬ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৪৫ জন, খুলনা বিভাগে ১৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ২৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ জন আর সিলেট বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ জন।

তাদের নিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত কেবল সরকারি হিসাবেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী সংখ্যা ৮ হাজার ৮৭০ জন। তার মধ্যে বরিশাল বিভাগের ৩ হাজার ৯৮৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের ১ হাজার ৩৫৫ জন, ঢাকা বিভাগের ৮৩৯ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭০৮ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১ হাজার ২৫২ জন, খুলনা বিভাগের ২৭৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগের ১১৮ জন, রাজশাহী বিভাগের ২৯০ জন, রংপুর বিভাগের ২৬ জন, সিলেট বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২২ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় যে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে তারা দুজনই পুরুষ। তাদের মধ্যে ৬০ বছর বয়সী একজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকার বেসরকারি বিআরবি হাসপাতালে। ৩৭ বছর বয়সী আরেকজনের মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

অধিদপ্তর জানাচ্ছে, মারা যাওয়া মোট ৩৬ জনের মধ্যে বরিশাল বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের, চট্টগ্রাম বিভাগের ৪ জনের, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭ জনের, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আর খুলনা বিভাগে ২ জন করে আর ঢাকা বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ আর রাজশাহী বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ১ জন করে ।

চলতি বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে জানুয়ারিতে মৃত্যু হয়েছিল ১০ জনের। ফেব্রুয়ারি এবং মে মাসে মৃত্যু হয়েছিল ৩ জন করে, এপ্রিলে মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের আর চলতি জুনে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের।

চলতি বছরে মোট মারা যাওয়া ৩৬ জনের মধ্যে পুরুষ ১৯ জন আর নারী ১৭ জন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found