ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার মোট কৃষিজমির পাঁচ শতাংশেরও কম এখন চাষযোগ্য বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং জাতিসংঘ স্যাটেলাইট কেন্দ্র (ইউএসওএসএটি)।
সোমবার প্রকাশিত উভয় সংস্থার প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে “উদ্বেগজনক” বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের গাজায় চলমান যুদ্ধের ফলে কৃষি অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজার মোট কৃষিজমির ৮০ শতাংশের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ জমিতে কৃষকরা আর কিছু করতে পারবে না। অর্থাৎ সেই জমি আর কৃষিযোগ্য নেই। মাত্র ৬৮৮ হেক্টর জমি, অর্থাৎ মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ জমিই এখন চাষের উপযোগী রয়েছে।
শুধু জমিই নয়, ধ্বংস হয়েছে গাজার গ্রিনহাউস ও পানির উৎসও। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার ৭১ দশমিক ২ শতাংশ গ্রিনহাউস এবং ৮২ দশমিক ৮ শতাংশ কৃষিকাজে ব্যবহৃত নলকূপ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এফএও উপ-মহাপরিচালক বেথ বেকডল বলেন, “এই ধ্বংস শুধু অবকাঠামো হারানোর ঘটনা নয়, এটি গাজার কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা এবং জনগণের জীবিকার মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলার শামিল।”
তিনি আরও বলেন, “একসময় যা খাবার, আয় ও স্থিতিশীলতা দিত, আজ তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কৃষিজমি, গ্রিনহাউস ও পানির উৎস ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন এটি পুনর্গঠন করতে হলে বিশাল বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দরকার, যাতে মানুষ আবার জীবিকা ও আশার সন্ধান পায়।”
এই গবেষণার আগে এই মাসেই প্রকাশিত “ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)” বিশ্লেষণেও গাজা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ১৯ মাসের যুদ্ধ, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে গাজার সমগ্র জনগণ বর্তমানে চরম দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইসরায়েল গত সপ্তাহে ঘোষণা দিয়েছিল, তারা ‘সীমিত’ পরিমাণে মানবিক সাহায্য ঢুকতে দেবে গাজায়। কিন্তু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, সেই সাহায্য অত্যন্ত অপ্রতুল এবং গাজার ক্ষুধার্ত জনগণের কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না।
এদিকে ইসরায়েলের বিমান হামলা প্রতিদিনই গাজায় বহু ফিলিস্তিনিকে হত্যা করছে।
সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী গাজা সিটির একটি স্কুলে বোমা হামলা চালায়। সেটি একটি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। হামলায় সেখানে আগুন লেগে যায় এবং কমপক্ষে ৩৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজন শিশু ছিল।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোর থেকে গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় ৫০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
এর আগেও এফএও গাজায় মানবিক সঙ্কট ও দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছিল। সংস্থাটির মতে, অবিলম্বে মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার পুনঃস্থাপন এবং অবরোধ তুলে না নিলে গাজায় দুর্ভিক্ষ, কৃষি ব্যবস্থার ধস এবং প্রাণঘাতী মহামারির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইপিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার মোট জনসংখ্যা– প্রায় ২১ লাখ মানুষ – বর্তমানে “চরম দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে” রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে ১৯ মাস ধরে চলা যুদ্ধ, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও তীব্র মানবিক সহায়তা সঙ্কট।
গত ১ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত গাজার ৯৩ শতাংশ জনগণ — অর্থাৎ প্রায় ১৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ — আইপিসি পর্যায় ৩ বা তার উপরের পর্যায়ে অবস্থান করছে। এটি নির্দেশ করে যে তারা “সঙ্কটময় অথবা আরও খারাপ” খাদ্য পরিস্থিতিতে রয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, ২ লাখ ৪৪ হাজার মানুষ রয়েছে আইপিসি পর্যায় ৫-এ, যাকে ‘বিপর্যয়’ বলা হয়। আর ৯ লাখ ২৫ হাজার মানুষ রয়েছে আইপিসি পর্যায় ৪-এ, অর্থাৎ ‘জরুরি’ অবস্থায়।
প্রতিবেদনে মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পুরো গাজা উপত্যকার জনগণই আইপিসি পর্যায় ৩ বা তার উপরের অবস্থায় থেকে যাবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
এফএও মহাপরিচালক কু ডংইউ এক বিবৃতিতে বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। মানবিক ও বাণিজ্যিক পণ্যের প্রবেশাধিকার জরুরি ভিত্তিতে এবং বৃহৎ পরিসরে পুনরায় চালু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“প্রতিটি বিলম্ব ক্ষুধার তীব্রতা বাড়াচ্ছে এবং দুর্ভিক্ষকে ত্বরান্বিত করছে। আমরা যত দেরি করব, দুর্ভিক্ষ ততই অনিবার্য হয়ে উঠবে।”
তথ্যসূত্র : আল জাজিরা ও বিবিসি।



