প্রেসিডেন্ট প্রার্থী একরেম ইমামোগলুর গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিভক্ত তুরস্ক।
একদল তার মুক্তির দাবিতে রাজপথে। আরেকদল তাকে গ্রেপ্তারের পেছনে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোয়ানের কোনও হাত দেখছে না।
আর তৃতীয় দল মনে করছে, ইমামোগলু দুধে ধোয়া তুলসী পাতা নয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনেক অভিযোগ রয়েছে। তবে এভাবে একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া অন্যায়।
এই তৃতীয় দল অনেকটা নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার চার দিন আগে গত ১৯ মার্চ দুর্নীতির অভিযোগে ইস্তাম্বুলের মেয়র ইমামোগলুকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকেই বিক্ষোভে উত্তাল তুরস্ক।
ইমামোগলুকে গ্রেপ্তারের প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলন এখন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। তবে তা কতটা সফল হবে, এনিয়ে সন্দেহ আছে।
ইমামোগলু ও তার সমর্থকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল ও ক্ষমতা আরও কুক্ষিগত করার স্বার্থে বিরোধী দলের এই নেতাকে কারাগারে বন্দি করে রেখেছেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।
অন্যদিকে এরদোয়ান সরকার ও তার সমর্থকরা বলছেন, বিচার বিভাগ তার মতো করে কাজ করছে। এখানে সরকারের কোনও হস্তক্ষেপ নেই।
এই দু’পক্ষের বাইরে থাকা অংশ বলছে, ইমামোগলুর বিরুদ্ধে নেওয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কেবল আইনি মামলা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক মামলা।
তাদের একজন সিনার ইলেরি। ২৮ বছরের এই তরুণ আল জাজিরাকে বলেন, “আমি ইমামোগলুকে সমর্থন করি না। তাকে আমি ভোট দিইনি।
“তবে আমি মনে করি, তার সঙ্গে যা হয়েছে, তা অন্যায়। রাজনৈতিক স্বার্থ এখানে জড়িত।”
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্কের পৌরসভাগুলোতে দুর্নীতি ছেয়ে গেছে। দেশটির পার্লামেন্টে এনিয়ে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদন বলা হয়, পৌরসভাগুলোতে দুর্নীতি বন্ধে পর্যাপ্ত নজরদারি ও ভারসাম্য প্রয়োগ করা হয়নি।
তবে তুরস্কের জনগণের একাংশের মতে, দুর্নীতি মোকাবেলা করতে গিয়ে তুরস্ক সরকার কেবল বিরোধী দলের রাজনীতিকদের নিশানা করেছে। এর ফলে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সরকারের অঙ্গীকার নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
এই বক্তব্য অবশ্য মানতে নারাজ এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দল একে পার্টি। দলটির সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা সাংবাদিক হিলাল কাপলান বলেন, “ইমামোগলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে তার নিজের দল সিএইচপির একজন সদস্যই করেন।
“তিনিই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করেন, প্রমাণ উপস্থাপন করেন।”
এরদোয়ান সরকার রাজনৈতিক হুমকি মনে করে ইমামোগলুকে টার্গেট করেছে-এই দাবি ‘নির্লজ্জ মিথ্যা’ ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে করেন কাপলান।

বিক্ষোভে ভাটা
ইস্তাম্বুলে পরপর দুটি মেয়র নির্বাচনে জয়ী ইমামোগলুকে এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এরদোয়ান ২০০৩ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন এবং ২০২৩ সালে তুরস্কের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন।
১৯৯৯ সালে কারাবন্দি হওয়ার আগ পর্যন্ত নব্বইয়ের দশকে ইস্তাম্বুলের একজন জনপ্রিয় মেয়র ছিলেন এরদোয়ানও।
গত ১৯ মার্চ গ্রেপ্তারের আগের দিন ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটি ইমামোগলুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বাতিল করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি অবৈধভাবে অর্জন করা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য একজন প্রার্থীর বৈধ ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক।
বিক্ষোভে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নেওয়া সিনার ইলেরি বলেন, “কী হতে যাচ্ছে, জনগণ কী ভাবছে, তা দেখার জন্য আমি বিক্ষোভে আছি।
“বিক্ষোভ শুরুর চারদিন পর আমার মনে হয়েছে, আন্দোলনের গতিতে কিছুটা ভাটা পড়েছে।”
তিনি বলেন, “গত রবিবার ইমামোগলুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়।
“সেদিন আমি ছিলাম বিক্ষোভ সমাবেশে। বিশেষ কিছু সেদিন আমি হতে দেখিনি। অনেকে এর সঙ্গে ২০১৩ সালের গেজি পার্ক আন্দোলনের তুলনা করছেন। আমার এই দুটি ঘটনা তুলনাযোগ্য মনে করছি না।”

পরিবর্তন চায় তুর্কিরা
তুরস্কের আরেক তরুণ ২২ বছর বয়সী আলিও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি না, ইমামোগলু বা সিএইচপি এখানে প্রধান ইস্যু। আমরা ২৪ বছর ধরে ক্ষমতাসীন এ কে পার্টির অবৈধ সিদ্ধান্তে ক্লান্ত।”
আলি বলেন, “আমরা আমাদের জীবন, স্বাধীনতা এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আমি ইমামোগলুকে পছন্দ করি, তবে তাকে ভালোবাসি না।
“রাজনীতিকদের মধ্যে তিনিই সেরা বিকল্প। তিনি সবসময় সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে গেছেন। আমি বিশ্বাস করি, সরকার যদি তাকে সুযোগ দিত, তাহলে তিনি জনগণের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারতেন।”
এই তরুণ আরও বলেন, “আমরা যদি পরিবর্তন চাই, তাহলে আমাদের প্রতিবাদ জারি রাখা জরুরি। বসে থেকে দর্শকের ভূমিকা পালন করলে কোনও কিছুর পরিবর্তন হবে না।”
তিনি বলেন, “বিক্ষোভ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমি সবসময় বিশ্বাস করি, আমাদের সবার নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করা উচিত।
“শিক্ষার্থী ও জেনজি হওয়ার কারণে অনেকে মনে করেন, আমরা দেশের পরিস্থিতি নিয়ে ভাবি না। এখন আমাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে দেখে তারা বিস্মিত।”

নেতৃত্বে শক্তিশালী সংগঠনের অভাব
ইমামোগলু গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে ইস্তাম্বুলের বাসিন্দারা প্রতিদিন রাতে জানালা থেকে হাঁড়ি-পাতিল পিটিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তাদের একজন ফুরকান। পেশায় জিম ট্রেইনার।
পাতিলে আঘাত দিতে দিতে তিনি বলে ওঠেন, “ন্যায়বিচার কোথায়? গণতন্ত্র কোথায়?”
রাতের বেলা জানালা থেকে এভাবে প্রতিদিন প্রতিবাদ জানানো ফুরকান সন্দিহান, এই আন্দোলন আদৌ এরদোয়ান সরকারের পতন ঘটাতে পারবে কি না।
ফুরকান বলেন, “আমি রাজপথে সেই আগুন দেখছি না। সেই উদ্যমও দেখছি না। যা হয়েছে, তাতে মানুষ ক্ষুব্ধ। কিন্তু কেবল ক্ষোভ থাকলেই হবে না।”
তুরস্কের উসকুদার পৌরসভায় থাকেন ২৮ বছর বয়সী আবুদাল্লাহ। তিনি এই আন্দোলনে অংশ নেননি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “যার দুর্নীতি প্রকাশ হয়ে গেছে, তার জন্য রাজপথে প্রতিবাদ করা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি।”
আবুদাল্লাহ জানান, ২০১৯ সালে ইমামোগলু যখন প্রথম মেয়র নির্বাচনে জয়ী হন, তখন তার প্রতি কিছুটা সহানুভূতি ছিল তার। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। এরদোয়ানের একে পার্টির সমর্থকরা মনে করে, ইমামোগলু দুর্নীতি ও সন্ত্রাসীদের কাছে অর্থ পাচারে জড়িত।
তিনি বলেন, “সামনে ঈদের ছুটিতে মানুষ বাড়ি যাবে। আর তখনই আন্দোলন থেমে যাবে।”
ইমামোগলুর মুক্তির দাবিতে তুর্কিদের বিক্ষোভ আন্দোলনকে ‘অসংগঠিত ও স্বতস্ফূর্ত’ হিসেবে দেখছেন ৩২ বছর বয়সী মেসাত।
তিনি বলেন, “আন্দোলনে অংশ নেওয়া বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যাদের বয়স ২০-২৫ বছরের মধ্যে। তারা কোনও সংগঠনের নয়। কয়েকজন বাম সংগঠন করে।
“আন্দোলনকারীরা কোনও সংগঠনের না হওয়ায় স্পষ্ট কোনও দিকনির্দেশনা নেই। তরুণরা কেবল ক্ষুব্ধ। কিন্তু এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে রোডম্যাপ ঠিক করার মতো কোনও শক্তিশালী সংগঠন দেখছি না।”



