ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক, নার্স পাঠিয়ে আসছে কিউবা। এসব দেশের স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিস্ট দেশটির অবদান অনস্বীকার্য।
এটি জানার পরও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বলেছে, কিউবার চিকিৎসা মিশনের সঙ্গে কাজ করছে বা সমর্থন দিচ্ছে, এমন ব্যক্তিদের মার্কিন ভিসা বাতিল করা হবে।
যুক্তি হিসাবে বলা হয়েছে, লাতিন আমেরিকার দেশটির চিকিৎসা মিশন জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত এবং তা কিউবান সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই হুমকিতে স্বভাবতই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ক্যারিবীয় অঞ্চলের নেতারা। কেউ কেউ ক্ষুব্ধও। কারণ স্বাস্থ্যসেবায় তারা ফিদেল কাস্ত্রোর দেশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ক্যারিবীয় নেতাদের কয়েকজন এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকির প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, কিউবান চিকিৎসক-নার্সদের পেতে দরকার পড়লে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ত্যাগ করতেও রাজি আছেন।
কিউবার চিকিৎসা কর্মসূচির দিকে চোখ কেন
ট্রাম্পের প্রশাসন এই প্রথম কিউবার চিকিৎসাসেবা মিশনের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়েছে, তা নয়। এর আগে ২০১৭-২০২১ সাল পর্যন্ত তার প্রথম শাসনামলেও কিউবার বৈশ্বিক চিকিৎসা কর্মসূচির ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই মিশন ‘মানব পাচারের’ সমতুল্য। কারণ নিজেদের চিকিৎসকদের কম বেতন দেয় কিউবা সরকার।
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি ঘোষণা দেন, কিউবার চিকিৎসা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি যেকারোর ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। এই নিষেধাজ্ঞা বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপরও প্রযোজ্য হবে।
কিউবার চিকিৎসা কর্মসূচিকে ‘জোরপূর্বক শ্রমের একটি ধরন’ হিসাবে দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও।
যদিও তার এই দাবির পক্ষে কোনও অকাট্য প্রমাণ আজ পর্যন্ত দেখাতে পারেনি ট্রাম্পের বিগত ও বর্তমান প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, কিউবা সরকার তার চিকিৎসাকর্মীদের বেতনের বেশিরভাগ আটকে রাখে এবং তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে।
কিছু কিউবান চিকিৎসক তাদের দেশের এই কর্মসূচির সমালোচনা করলেও বেশিভাগই জানিয়েছেন, তারা স্বেচ্ছায় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।

ট্রাম্প প্রশাসন কি আইনত ভিসা বাতিল করতে পারে
আইনানুসারে পররাষ্ট্র দপ্তরের মাধ্যমে ভিসা নীতির ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সরকার।
জাতীয় নিরাপত্তা বা বৈদেশিক নীতি সম্পর্কিত উদ্বেগের কথা বলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায় সেখানে।
এমন কোনও পদক্ষেপ তারা নিলে কূটনৈতিক বা আইনিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো।
তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর ল্যাটিন আমেরিকান অ্যান্ড ল্যাটিনো স্টাডিজের অর্থনীতিবিদ টামারিজ বাহামন্ড জানান, কিউবার চিকিৎসা মিশনকে লক্ষ্য করে আক্রমণ ট্রাম্প প্রশাসনের একক উদ্যোগ নয়।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “প্রস্তাবিত ভিসা নিষেধাজ্ঞা মূলত বাইডেন প্রশাসনের শুরু করা একটি নীতির সম্প্রসারণ।
“২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাইডেন একটি ব্যয় বিলে সই করেন, যাতে কিউবার চিকিৎসাসেবার সঙ্গে চুক্তি করা তৃতীয় দেশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়।
“সে বছর তার প্রশাসন কিউবার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলে, দেশটি তার চিকিৎসাকর্মীদের থেকে লাভ করছে।”
ক্যারিবীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া কী
ক্যারিবীয় নেতারা ঘোষণা করেছেন, কিউবার চিকিৎসা মিশন চালু রাখার জন্য প্রয়োজনে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার অধিকার ত্যাগ করবেন।
এ সপ্তাহে বার্বাডোজের প্রধানমন্ত্রী মিয়া মটলি পার্লামেন্টে জোর গলায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে ‘অন্যায় ও অযৌক্তিক’ হিসাবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, “কিউবার চিকিৎসক ও নার্সদের সাহায্য ছাড়া আমরা করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলা করতে পারতাম না।”
অন্যদিকে ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর প্রধানমন্ত্রী কিথ রাওলি সতর্ক করে বলেন, ক্যারিবীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অগ্রহণযোগ্য।
তিনি বলেন, “কোনও কারণ ছাড়াই এখন আমাদের মানবপাচারকারী বলা হচ্ছে, কারণ আমরা সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক দিয়ে দক্ষ চিকিৎসাকর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকি।”
দরকার পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার মায়া ত্যাগ করতেও রাজি বলে আল জাজিরাকে জানান রাওলি।
একইভাবে সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিন্সের প্রধানমন্ত্রী রালফ গনসালভেস কিউবান চিকিৎসকদের রোগীর ওপর সরাসরি প্রভাব তুলে ধরে বলেন, “কিউবানরা না থাকলে আমরা হয়তো স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করতে পারব না।
“৬০ জন দরিদ্র ও কর্মজীবী মানুষের মৃত্যুর চেয়ে আমি আমার ভিসা হারাতেই বেশি আগ্রহী।”
গত সপ্তাহে জ্যামাইকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামিনা জনসন স্মিথ সাংবাদিকদের বলেন, “তার সরকার কিউবান চিকিৎসকদের দেশের জন্য অপরিহার্য মনে করে।
“এখানে তাদের উপস্থিতি আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
জ্যামাইকায় বর্তমানে ৪০০ কিউবান চিকিৎসক, নার্স এবং চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ কর্মরত রয়েছেন।

কিউবানরা না থাকলে কী হবে
কিউবার ২৪ হাজারের বেশি চিকিৎসক বিশ্বের ৫৬টি দেশে কাজ করছেন।
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের পাশাপাশি গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও সীমিত চিকিৎসা পরিষেবাসম্পন্ন দরিদ্র দেশে স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার মিশনে নিয়োজিত তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের চোখ রাঙানিতে কিউবার স্বাস্থ্যসেবা ক্যারিবীয় অঞ্চল না পেলে সেক্ষেত্রে কী হবে, এ প্রশ্নের জবাবে অর্থনীতিবিদ বাহামন্ড বলেন, “ক্যারিবীয় দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব নির্ভর করবে তাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় কিউবান চিকিৎসকরা কতটা অপরিহার্য এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল সম্প্রদায়গুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত না করে স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের প্রতিস্থাপন করা কতটা কঠিন।”
অনেক ক্যারিবীয় দেশের জন্য স্বল্পমেয়াদী পরিণতি বিধ্বংসী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। তাছাড়া প্রশিক্ষিতরা প্রায়ই অন্যান্য দেশে চলে যায়। এতে স্থায়ী ঘাটতি রয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তথ্য সূত্র : আল জাজিরা



