একটি কলেজের নামফলক খুলে মিছিল করে যাচ্ছে আরেকটি কলেজের ছাত্ররা। এমন ছবি-ভিডিও গত ১০ সেপ্টেম্বর সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছিল। সেসব পোস্টে এমন মন্তব্যও এসেছিল- ‘আজকের খেলায় ঢাকা কলেজ বিজয়ী’।
তবে সেটি খেলা ছিল না, ছিল মারামারি। সেই মারামারির পর আইডিয়াল কলেজের নামফলকটি খুলে নিজেদের ক্যাম্পাসে নিয়ে যায় ঢাকা কলেজের ছাত্ররা।
ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার বেসরকারি আইডিয়াল কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে সরকারি ঢাকা কলেজের ছাত্রদের মারামারি এই প্রথম নয়। হরহামেশাই সংঘর্ষে জড়ায় কয়েকশ গজ দূরত্বে থাকা কলেজ দুটির শিক্ষার্থীরা।
এই দুই কলেজের পাশে থাকা সিটি কলেজের নামও আসে এমন সংঘর্ষে। কখনও ঢাকা-সিটি, কখনও সিটি-আইডিয়াল, কখনও ঢাকা-আইডিয়াল, এমন সব সংঘর্ষ বছরে তিন-চারবার খবরের শিরোনাম হয়ে ওঠে।
ওই এলাকায় থাকা ইম্পেরিয়াল কলেজের নামও আসত এক সময় এমন সংঘর্ষে; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ঠিকানা বদলের পর আর সংঘর্ষে নেই তারা।
দেশের সর্বপ্রাচীন কলেজ ঢাকা কলেজের প্রতিষ্ঠা ব্রিটিশ আমলে ১৮৪১ সালে। সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠা পাকিস্তান আমলে ১৯৫৭ সালে। আর সেন্ট্রাল রোডে আইডিয়াল কলেজের যাত্রা শুরু ১৯৬৯ সালে।
ঠিক কবে থেকে এসব কলেজের ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে মারামারিতে জড়াচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে দেড় দশক আগে এই কলেজগুলোতে পড়ে আসা শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারও আগেও মারামারির খবর শুনেছেন তারা।
এই মারামারির কারণ হিসাবে পাওয়া যাচ্ছে প্রেমঘটিত জটিলতা, উত্ত্যক্ততা ও আধিপত্য বিস্তার।
আবার কাছাকাছি হলেও তিনটি কলেজের অবস্থান তিনটি থানায়; ফলে মারামারি বাঁধলে তিন থানার পুলিশকে হ্যাপা নিতে হয়।
কী নিয়ে এবার মারামারি
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে নেতৃত্বে ছিল শিক্ষার্থীরা। ফলে গত গত ৫ আগস্টের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই রয়েছে শিক্ষার্থীদের দাপট।
এর মধ্যেই গত ১০ সেপ্টেম্বর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে আইডিয়াল কলেজ ও ঢাকা কলেজের ছাত্ররা। এর পেছনে প্রেমঘটিত বিষয় ছিল বলেই জানা যায়।
সেদিন সকালে সংঘর্ষের শুরু হয় ঢাকা কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে। সেখানে আইডিয়াল কলেজের একদল শিক্ষার্থী এসেছিল।
ঢাকা কলেজে সহশিক্ষা নেই বলে কোনও নারী শিক্ষার্থী নেই। কিন্তু আইডিয়াল ও সিটি কলেজে সহশিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, এক নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ঢাকা কলেজের কয়েক শিক্ষার্থীর সঙ্গে আইডিয়ালের শিক্ষার্থীদের তর্কাতর্কি হয়। তারপর ঢাকা কলেজের ছাত্ররা জোট বেঁধে গিয়ে আইডিয়ালে হামলা চালায় এবং প্রতিষ্ঠানের নামফলক খুলে নিয়ে আসে।
তার প্রতিশোধ নিতে ঢাকা কলেজের একটি বাসে গত ১৫ সেপ্টেম্বর হামলা চালায় আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা।
তাতে উত্তেজনা আরও বাড়ে। বাস ভাংচুরের পর ঢাকা কলেজ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ফেইসবুক গ্রুপে র একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের একটি হলে বক্তব্য দিতে দেখা যায় । সেখানে হুঁশিয়ার করা হয়, সুষ্ঠু বিচার না হলে আইডিয়াল কলেজ এখান থেকে তুলে দেওয়া হবে। আইডিয়াল কলেজের ইট খুলে নেওয়া হবে।
সোশাল মিডিয়ায় আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরাও ঢাকা কলেজ নিয়ে একই রকম সরব।
ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলা সংকট সমাধানে দুই কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছে সেনাবাহিনী। দুই পক্ষ বসে সমাধান করে সংবাদ সম্মেলনের কথা রয়েছে।

মারামারি লেগে থাকত আগেও
২০০৭ সালে আইডিয়াল কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা শাখার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন আনিস (ছদ্মনাম)। তিনিও এমন মারামারি দেখে এসেছেন।
আইডিয়ালের বেতন জমা দিতে হতো ঢাকা কলেজের বিপরীত পাশে জনতা ব্যাংকে। তবে সেটা ঢাকা কলেজের সামনে হওয়ায় যেতে ভয় পেত আইডিয়ালের শিক্ষার্থীরা।
আইডিয়ালের সাবেক এই শিক্ষার্থী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এ রকম অনেক মাস গেছে, টাকা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যেতে পারিনি, কারণ নতুন করে সংঘর্ষ সৃষ্টি হতে পারে।”
গাউছিয়া মার্কেটে এরোপ্লেন মসজিদের সামনে তখন তার বাসা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “সেখান থেকে খুব সহজেই মিরপুর রোড হয়ে কলেজে যাওয়া যায়। কিন্তু মারামারি এড়াতে বাটা সিগন্যাল হয়ে তারপর কলেজে যেতাম।”
কেন মারামারি হত- জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রেমঘটিত কারণে বেশি হতো। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে পুরো কলেজ জড়িয়ে পড়ত।
“মেয়েদের সঙ্গে প্রেম, ইভ টিজিং নিয়ে নানা ঘটনা ঘটত। আমাদের সময় আইডিয়াল কলেজ এবং ঢাকা কলেজে দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হতো। ঢাকা কলেজে কোনও মেয়ে পড়ে না। তবে আইডিয়ালে দেড়শ থেকে দুইশ মেয়ে ভর্তি হতো। মূলত, এসব ঘটনা গ্রুপকে কেন্দ্র করে হইতো। এসব সংঘর্ষের নেতৃত্বে এসব ছোটো ছোটা গ্রুপ কাজ করতো। সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানতোই না, আসলে কী কারণে সংঘর্ষের সৃষ্টি।”
এই শিক্ষার্থী তার সময়ে সক্রিয় থাকা দুটি গ্রুপের কথা জানান। সেগুলো হলো- ‘এমএস থার্টিন’ ও ‘কেজি ক্রস’, যারা আইডিয়াল কলেজের হয়ে মারামারি করত।
এই কলেজগুলোর মধ্যে শুধু ঢাকা কলেজেই ছাত্র সংগঠনগুলোর তৎপরতা রয়েছে।
‘ছাত্র রাজনীতি’ থাকায় কলেজটি এসব সংঘর্ষে ‘বেনিফিট’ পেত বলে মনে করেন ঢাকা কলেজের ২০০৭ সালের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী আসলাম (ছদ্মনাম)।
সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “মূলত, মেয়েদের সঙ্গে প্রেম, ইভ টিজিংসহ নানা কারণে এই মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষের ঘটনা অনেক পুরাতন। মেয়েদের ইভ টিজিং করা, প্রেম- এসব ঘিরেই বাস ভাঙচুরসহ ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।”
প্রতিবছর তিন থেকে চারবার বড় ধরনের সংঘর্ষ বাধত জানিয়ে কলেজটির সাবেক এই শিক্ষার্থী বলেন, “ইম্পেরিয়াল কলজ যখন ঢাকা কলেজের পাশে ছিল, তখন প্রতিবছরই ওদের সঙ্গে এ ঘটনা ঘটতো। এই কলেজটি যখন রামপুরায় চলে যায়, তখন সংঘর্ষের বিষয়টা কমে আসে।
“তবে তখন সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের সঙ্গে মারামারি হইতো। ঢাকা কলেজে রাজনীতি থাকার কারণে এসব বিষয় রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা নিয়ন্ত্রণ করত। এ কারণে ঢাকা কলেজ বেশি বেনিফিট পাইতো। যার ফলে এই সমস্যার কখনোই সমাধান হয়নি।”
প্রেম, উত্ত্যক্ততা কিংবা আধিপত্য বিস্তারের বাইরেও অন্য এলাকার ঘটনা নিয়েও এসব কলেজগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ বাধত বলে জানান সিটি কলেজে ২০০৯ সালে ভর্তি হওয়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইমন হোসেন (ছদ্মনাম)।
সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “আমি যখন প্রথম বর্ষে পড়ি, হঠাৎ করে খবর এল ধানমণ্ডি লেকে আমাদের অনার্সের এক আপুকে ঢাকা কলেজের এক ছেলে ওড়না ধরে টান দিয়েছে। তার সঙ্গে যেসব অনার্সের শিক্ষার্থী বাধা দিতে গিয়েছিল, তাদেরও মারধর করা হয়।
“তারপর পুরো কলেজের অনেক ছেলে মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, আজকে আর ক্লাস হবে না। আমরা ঢাকা কলেজের সঙ্গে মারামারি করতে যাব। পরে দফায় দফায় সেদিন মারামারি চলে আশেপাশের এলাকাজুড়ে।”
তিনি বলেন, “ধানমণ্ডি জোনের মধ্যে অনেকগুলো কলেজ। ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ, এক সময় ইম্পেরিয়াল কলেজ ছিল, আইডিয়াল আছে। ওইদিকে আবার রাইফেলস কলেজ। আলাদা কলেজে ভর্তি হলেও কেউ কেউ স্কুলে এক সঙ্গে পড়ত, ফলে যাতায়াত থাকত।”
ওই এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা বলছেন, এই কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা দেখা যায় এক কোচিং সেন্টারে যায়, আড্ডা দেয় ধানমণ্ডি লেক ও চায়ের দোকানগুলোতে একসঙ্গে। এসব স্থানে ছোটখাটো সমস্যা হলেই বিষয়টি কলেজে-কলেজে মারামারিতে গড়িয়ে যায়।



