বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে বিলুপ্ত হচ্ছে বন্য পাখি। এমনই এক পাখি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে হানিক্রিপার। এরই মধ্যে পাখিটির ৩৩ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে। বিপন্ন অবস্থায় আছে বাকি ১৭ প্রজাতি।
হাওয়াইয়ের এই পাখি বিলুপ্ত হচ্ছে মশার কারণে। মশার কামড়ে এভিয়ান ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে হানিক্রিপার পাখিরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হানিক্রিপার রক্ষায় অবিলম্বে পদক্ষেপ না নিলে এক বছরের মধ্যেই এই পাখি পুরোপুরি বিলুপ্ত হতে পারে।
সমস্যা সমাধানে হাওয়াইয়ে হেলিকপ্টার থেকে কোটি কোটি মশা ছাড়া হয়েছে। অঞ্চলটিতে ১৮০০ সালের দিকে ইউরোপীয় ও আমেরিকান জাহাজের মাধ্যমে মশা ছড়ায়। এর আগে সেখানে কোনও মশা ছিল না।
এভিয়ান ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কোনও প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কাজ করে না। ফলে হাওয়াইয়ের পাখিরা মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে।
আশঙ্কাজনক এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশবিদরা একটি অভিনব কৌশলের মাধ্যমে বিলুপ্তির শিকার পাখিদের রক্ষার চেষ্টা করছেন। তারা মশা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
প্রতি সপ্তাহে হাওয়াইয়ের দ্বীপগুলোতে হেলিকপ্টারে করে আড়াই লাখ পুরুষ মশা ছাড়া হচ্ছে। মশাগুলোতে ওলব্যাচিয়া নামক একটি প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা জন্ম নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। এরই মধ্যে ১০ মিলিয়নের বেশি মশা ছাড়া হয়েছে।
হাওয়াইয়ের মাউয়াই দ্বীপের হালিয়াকালা জাতীয় উদ্যানের পাখি কর্মসূচির সমন্বয়ক ক্রিস ওয়ারেন বলেন, “আমাদের চেষ্টা না করার ফলে যদি পাখিগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়, সেটা হবে আরও দুঃখজনক। চেষ্টা না করে আমরা থাকতে পারি না।”
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যান পরিষেবার তথ্য অনুসারে, হাওয়াইয়ের হানিক্রিপার পাখির একটি প্রজাতি আকিকিকি। এর সংখ্যা ২০১৮ সালেও ছিল ৪৫০। কিন্তু ২০২৩ সালে এই সংখ্যা দাড়ায় মাত্র ৫। বর্তমানে কাউয়াই দ্বীপে মাত্র একটি আকিকিকি পাখি জীবিত আছে।

হানিক্রিপার পাখিরা তাদের গান ও বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। এদের প্রত্যেক প্রজাতির ঠোটের গড়ন ভিন্ন। ফলে তাদের খাদ্যরীতিও আলাদা। তবে শামুক, ফল ও মধু তাদের প্রিয় খাবার। উদ্ভিদের পরাগায়ন ও পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে হানিক্রিপাররা।
হাওয়াইয়ের পাখিরা দীর্ঘ সময় ধরে মশাবাহিত রোগের সংস্পর্শে আসেনি। ফলে তাদের শরীরে এই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। উদাহরণ হিসাবে, একটি লাল হানিক্রিপার মশার কামড়ে আক্রান্ত হলে তার মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ।
অধিকাংশ হানিক্রিপার পাখি ১২০০ থেকে ১৫০০ মিটার উচ্চতায় বাস করে। এই উচ্চতায় মশা যেতে পারে না। কারণ সেখানে তাপমাত্রা খুব কম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মশারাও উচু এলাকায় যেতে পারছে।
বিজ্ঞানীরা ইনকম্পাটিবল ইনসেক্ট টেকনিক (আইআইটি) ব্যবহার করছেন হানিক্রিপার রক্ষায়। এই পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়াযুক্ত পুরুষ মশা ছাড়া হয়। এই ব্যাকটেরিয়াটি বন্য নারী মশার সঙ্গে প্রজননের পর ডিম ফুটতে বাধা দেয়।
নারী মশা কেবল একবার প্রজনন করে। যখন ওলব্যাচিয়া সংক্রমিত পুরুষ মশা নারী মশার সঙ্গে প্রজনন করলে তাদের ডিম ফুটে না। এতে করে মশার জনসংখ্যা ক্রমশ কমে যায়।
পাখিদের রক্ষায় ওলব্যাচিয়া ব্যবহারের ধারণা নতুন নয়। এরই মধ্যে চীন ও মেক্সিকোতে মশার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া ও ফ্লোরিডায় ওলব্যাচিয়া ব্যবহার করে মশার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রোগ্রাম চালু আছে।
হাওয়াইয়ে এই প্রকল্পটি চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস, হাওয়াই রাজ্য ও মাউয়াই ফরেস্ট বার্ড রিকভারি প্রকল্প।
তথ্যসূত্র : দ্য গার্ডিয়ান।



