Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

মাহফুজা খানমের একাত্তর

মাহফুজা খানম।
মাহফুজা খানম।
[publishpress_authors_box]

ডাকসুর ভিপি ছিলেন, শিক্ষক হিসাবেও ছিলেন কৃতী; সেই সব ছাপিয়ে নিজের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েই বেশি গর্বিত ছিলেন মাহফুজা খানম।  

একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি গায়ে বিস্ফোরক বেঁধে সরাসরি অভিযানে নেমেছিলেন তিনি।

৮০ বছর বয়সে মঙ্গলবার চিরবিদায় নিলেন এই মুক্তিসেনা; কীর্তিমান জীবনের জন্য যাকে স্মরণ করছে বিভিন্ন সংগঠন।

মাহফুজা খানমের জন্ম কলকাতায় ১৯৪৬ সালের ১৪ এপ্রিল। তার বাবা মোস্তাফিজুর রহমান খান ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।

মাহফুজার ম্যাজিস্ট্রেট দাদাও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কর্মী, মাস্টারদা সূর্য সেনের শিষ্য হিসাবে তার নামও ছিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সঙ্গে। চাচা ছিলেন নেতাজী সুভাষ বসুর শিষ্য।

ভারত ভাগের পর ঢাকায় স্বামীবাগে পৈত্রিক বাড়িতে বড় হন মাহফুজা। তাদের বাড়িটি ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র।

সেই সূত্র ধরে ১৯৬১ সালে ইডেন কলেজে ভর্তির পর সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন মাহফুজা; যোগ দেন ছাত্র ইউনিয়নে। ১৯৬২-এর হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির পরও রাজনীতির পথচলা ছিল অব্যাহত; সেই পথ ধরে ১৯৬৬-৬৭ সালে উত্তাল সময়ে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন তিনি। ডাকসুর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী ভিপি তিনি।

রাজনীতিতে সক্রিয়তা তার পড়াশোনায় ছেদ ঘটায়নি। পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণী পেয়ে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। সুযোগ হয়েছিল যুক্তরাজ্যের সাসেক্স ইউনিভার্সিটিতে পড়ার, কিন্তু পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ায় যেতে পারেননি। কারণ পাসপোর্ট দেওয়া হযনি তাকে।

১৯৬৮ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম হয়েও পুলিশ ভেরিভিকেশনে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

মাহফুজা খানম তখন ডাকসুর ভিপি।

এর পরপরই আসে একাত্তর, মাহফুজার অন্য রকম পথচলা শুরু হয়।

২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর সকাল সন্ধ্যার এক আয়োজনে নিজের একাত্তর স্মৃতি তুলে ধরেছিলেন মাহফুজা খানম।

তার ভাষায়, ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতে দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ঢাকার পাড়ায় পাড়ায় ব্রিগেড তৈরি করা হলো। তাদের কাজ ছিল রাস্তায় রাস্তায় পালা করে পাহারা দেওয়া, হাতে থাকতো স্টিলের লাঠি আর বাঁশি। ভয় ছিল যে কোনও সময় আক্রমণ হতে পারে।

২৫ মার্চ রাতে দায়িত্ব ছিল মাহফুজা খানম আর তার স্বামী শফিক আহমেদের (সাবেক আইনমন্ত্রী)। সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত রাস্তায় টহল শেষ করে ঘরে ফেরেন তারা। তার বড় সন্তানের বয়স তখন মাত্র পাঁচ মাস (এই দম্পতির মোট ৩ সন্তান)।

হঠাৎ করেই গোলাগুলি, পুরানা পল্টনের রাস্তা দিয়ে রাজারবাগে সেনা কনভয় যাওয়ার ঘরঘর শব্দে সচকিত হয়ে উঠেছিলেন মাহফুজা।

“তখন তো বড় বড় ভবন ছিল না। বারান্দায় বের হয়ে দেখলাম আকাশ লাল, রক্তলাল। পুরানা পল্টন থেকে একেবারে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি, ততক্ষণে ইকবাল হল অ্যাটাক হয়ে গেছে, রোকেয়া হল, জগন্নাথ, সলিমুল্লাহ…এই হলগুলো অ্যাটাক করে ফেলেছে তারা।”

“জানালার কাচগুলো ঝরঝর করে ঝড়ে পড়ছে। ছেলেকে নিয়ে খাটের নিচে সারারাত কাটালাম। ভোর হলো। ২৬ মার্চ ছিল কারফিউ, বের হতে পারলাম না। ২৭ মার্চে কারফিউ তুলে নিলে আর ঘরে থাকতে পারলাম না।”

ছেলেকে স্বামীর হাতে দিয়ে এলাকার এক তরুণ রিকশাচালককে নিয়ে বের হয়েছিলেন মাহফুজা।

“রাস্তায় রাস্তায় আগুন তখনও ধিকিধিকি জ্বলছে, পোড়া মৃতদেহ…স্তব্ধ হয়ে গেলাম…বুঝতে পারছিলাম না, হোয়াট টু ডু অ্যান্ড হোয়াট নট টু ডু।”

“এখন ভাবি, সেসময় ওরকম দেখে শক্ত ছিলাম কী করে,” বলতে বলতে একটু দম নেন মাহফুজা খানম। তারপর বলেন, “এরপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ হতে শুরু করে পার্টির (কমিউনিস্ট পার্টি) সঙ্গে, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে। পার্টি থেকে ঢাকার দায়িত্ব দেওয়া হলো, সঙ্গে লেখক-সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারও থাকবেন।”

এরপর মুক্তিযুদ্ধে নামা, যাকে জীবনের আরেকটা অধ্যায় বলছেন মাহফুজা খানম।

“যারা ওদিকে (সীমানা পার হয়ে ভারতে) চলে গিয়েছিল, তারা তো অন্তত জীবন সম্পর্কে…হয়তো খাবার কষ্ট, থাকার কষ্ট…কিন্তু ঢাকাতে আমরা যারা ছিলাম, প্রতি মুহূর্তে বেঁচে রয়েছি কি না, এটা বোঝা যেত না। প্রতি রাতে নক করা হতো। আমাদের এলাকার অনেককে তুলে নিয়ে গেছে। শফিক সাহেব (শফিক আহমেদ) লিস্টে ছিলেন, আমিও লিস্টে ছিলাম।”

পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়া এড়াতে প্রায়ই নিজের বাসায় থাকতেন না মাহফুজা। এলাকার ভেতরের দিকে অন্যদের বাড়িতে চলে যেতেন।

তবে ২৫ মার্চের পর থেকেই তার বারান্দাসহ দুই কক্ষের বাড়িটিতিই মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা-খাওয়া শুরু হয়।
কাদের নামের বাবুর্চির কথা মনে করে মাহফুজা বলেন, “সে কোনোদিন বলেনি এত মানুষের রান্না করতে পারব না। ভাত-ডাল, সঙ্গে একটা তরকারি। কেউ দুপুরে, কেউ রাতে আসত খেতে। মোমবাতির আলোয় তারা খেত। কারণ আলো দেখলেই অ্যাটাক হতো।”

মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ানোর পাশাপাশি তথ্য আদান-প্রদানের কাজে নেমে পড়েন মাহফুজা।

“ওদিক থেকে চিঠি আসছে, সেগুলো পৌঁছে দিতে হতো এদিকে। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের হরলাল দাদা সাহায্য করতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ল্যাবরেটরি থেকে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য নিতে রহমান ভাই খুব সাহায্য করেছেন, এখানে নানা ধরনের বিস্ফোরক দ্রব্য তৈরি করতাম, নটর ডেম কলেজের ফাদাররা আমাদের সাহায্য করেছে…তখন পূর্ব পাকিস্তানে যারা ছিল, প্রত্যেকটা মানুষ ছিল মুক্তিযোদ্ধা।”

২০২৪ সালে ছাত্র ইউনিয়নের পুনর্মিলনীতে মাহফুজা খানম।

সেসময়ে এক ঘটনা স্মরণ করে মাহফুজা বলেন, “একবার সাইক্লোস্টাইল করে ইশতেহার নিয়ে হচ্ছি, কনভয় যাচ্ছে পাশ দিয়ে। নটর ডেমের কলেজের পাশ দিয়ে নালা ছিল অনেক বড়। সেখানে লাফ দিলাম, সেই পানির মধ্যে ছিলাম যতক্ষণ না কনভয়ের শব্দ শেষ হচ্ছিল। এক একটা দিন এমনও গিয়েছিল।”

এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল মাহফুজার। সে অর্থ পাঠাতে হতো নানা জায়গায়। এই কাজ হতো মাহফুজা খানমের বাবা মুস্তাফিজুর রহমান খানের জিন্নাহ এভিনিউর (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ) বিমা অফিসে।

এসব কাজ করতে করতে সরাসরি লড়াইয়েও নেমে পড়তে হয় মাহফুজা খানমকে।

“বড় দুটো অপারেশনে আমি যুক্ত ছিলাম। টিভি টাওয়ার অপারেশনে যুক্ত ছিলাম। পায়ে বেঁধে, গায়ে বেঁধে বিস্ফোরক রেখে এসেছিলাম সেখানে। আরেকটি ছিল সেগুন বাগিচার মোড়ে ইউএসআইএস লাইব্রেরি, সেখানেও বড় একটা অপারেশন করেছিলাম।”

কিন্তু এর মূল্য তাকে দিতে হয়েছে। বড় দুই ভাই ধরা পড়ল।

“আমার বাড়ি থেকেই দুই ভাইকে ধরা হলো…আমার মায়ের অবস্থা…এটা বলতে পারব না। আব্বাকে পুলিশ-আর্মিরা ঘিরে ধরে নিয়ে গেল। সবকিছু তছনছ হয়ে গেল …এগুলো বলে এখন আর লাভ নেই। আমরা যে অনেক কিছু করতে পেরেছি, তা নয়, কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য ছিল জানান দেওয়া…আমরা, মুক্তিযোদ্ধারা আছি…অ্যাক্টিভ আছি।”

যারা যুদ্ধে গিয়ে আহত কিংবা অসুস্থ হয়ে আসতেন, তাদেরকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেন মাহফুজা।

“ঠেলা গাড়িতে করে মাথায় কাপড় দিয়ে ছাতা মাথায় কখনও বোন, কখনও স্ত্রী সেজে কাঁদতে কাঁদতে নিয়ে যেতাম…অভিনয় যে কত করেছি! হাতিরপুলে ডা. আজিজুর রহমানের ছিল পলি ক্লিনিক। সেখানে নিয়ে আহতদের চিকিৎসা করাতাম। পলি ক্লিনিক সেসময় ভীষণভাবে সহযোগিতা করেছে। সেসময় যে কতবার ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে আসছি, এত বছর পরে এখন আর মনেও নেই।”

২০২১ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন মাহফুজা খানম।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের সাক্ষীও মাহফুজা খানম।

“আমি ভীষণ ভাগ্যবান। ঢাকা ক্লাবের উল্টো দিকেই তো পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করল। ঢাকা ক্লাবের ছাদে উঠে আমি সব দেখেছি, আমি খুব গর্বিত ছিলাম সেসমসয়। নিজের চোখে সব দেখতে পাচ্ছি।”

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর ঢাকা জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের ১৬৫ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে মাহফুজা খানমের নাম।  

অনেক ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এলেও মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ গড়ে না ওঠায় হতাশা ছিল মাহফুজা খানমের।

স্বাধীনতার পর শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনার পর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।

সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের বিশেষ করে নারী শিক্ষার জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৭টি শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনে যুক্ত ছিলেন।

বিশ্ব শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন মাহফুজা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট সদস্য ছিলেন তিনি। এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২১ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক পান মাহফুজা খানম। এছাড়া ২০১২ সালে নারী শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ‘বেগম রোকেয়া পদক’ লাভ করেন তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found