ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) এর আওতায় চলমান ও তালিকাভুক্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের অন্তত ১১টি প্রকল্প বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে দুই দেশের সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দুইদিন ব্যাপী এলওসি রিভিউ মিটিংয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৩তম এলওসি রিভিউ মিটিং শেষ হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ইআরডির অতিরিক্ত সচিব মিরানা মাহরুখ। আর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্রেডিট লাইনের পরিচালক সুজা কে মেনন ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
রাজধানীর শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক হয়। এর আগে গত বছরের এপ্রিল মাসে ভারতের নয়াদিল্লিতে ২২তম এলওসি রিভিউ বৈঠক হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে ২৩তম বৈঠক হওয়ার কথা ছিল ঢাকায়।
তবে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে গত আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে পর দুই দেশের সম্পর্কে সৃষ্ট রাজনৈতিক টানাপোড়নে বৈঠকটি হয়নি। ১১ মাস পর হলো সেই এলওসি রিভিউ বৈঠক।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ভারতের সঙ্গে তিনটি এলওসির আওতায় প্রায় ৭২০ কোটি ডলারের সমঝোতা চুক্তি হয়। এই বিপুল ঋণ দিয়ে প্রাথমিকভাবে ৪১টি প্রকল্প তালিকাভুক্ত করা হয়। পরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় এলওসি থেকে তিনটি করে ছয়টি প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়।
বর্তমানে তিনটি ভারতীয় এলওসির মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য ৩৫টি প্রকল্প তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম এলওসির আওতায় ১১২ কোটি ডলার ব্যয়ে ১৫টি প্রকল্প রয়েছে, যার মধ্যে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে।
দ্বিতীয় এলওসির আওতায় ২০৮ কোটি ডলার দিয়ে ১২টি প্রকল্প চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে দুটি প্রকল্পে কাজ শেষ হয়েছে, সাতটির কাজ চলছে। বাকি তিনটি প্রকল্প প্রাথমিক তালিকায় রয়েছে।
তৃতীয় এলওসির আওতায় প্রায় ৪০৬ কোটি ডলার দিয়ে ১৩টি প্রকল্প চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে আটটি প্রকল্পের কাজ চলছে। পাঁচটি প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পর্যায়ে রয়েছে।
এ পর্যন্ত মোট ১৮০ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে।
এর মধ্যে চলতি অর্থ বছরে ভারত মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ছাড় করেছে বলে জানিয়েছেন ইআরডির একজন কর্মকর্তা।
ইআরডির পক্ষ থেকে বৈঠকে যোগ দেওয়া ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এলওসির আওতায় যেসব প্রকল্পের তালিকা রয়েছে সেটাকে যৌক্তিকীকরণ করার বিষয়ে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে খুবই ফলপ্রসূ আলাপ হয়েছে।”
তিনি বলেন, “প্রায় ১৫ বছর আগে চুক্তি হওয়া প্রকল্পও এখনও বাস্তবায়ন শেষ হয়নি। অথচ এসব প্রকল্পের ঋণের রেয়াতকাল অতিবাহিত হয়ে ঋণ পরিশোধের মেয়াদও শেষ দিকে। যেখানে বিদেশি ঋণ নিয়ে কোনও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রেয়াতকালের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য থাকে।
“পরবর্তীতে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক লভ্যাংশ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যুক্ত করে ঋণ পরিশোধকে উদ্দেশ্য করে বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়।”
ইআরডির ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে কৌশলগত দিক চিন্তা করে ভবিষ্যতে যেন এলওসির আর কোনও সমস্যা না হয় সে চিন্তা করে বাংলাদেশ এলওসির তালিকা যৌক্তিকভাবে (সংশোধন) করার প্রস্তাব দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “চলমান কোনও প্রকল্প বাদ যাবে না। তবে যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয়নি এবং যেসব প্রকল্প অনুমোদন পেলেও দরপত্র চূড়ান্ত হয়নি- এই রকম প্রকল্প থেকে বেশ কিছু প্রকল্প বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।”
বৈঠকে অংশ নেওয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে দুপক্ষের মধ্যে এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইআরডির অতিরিক্ত সচিব মিরানা মাহরুখ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “রিভিউ মিটিংয়ে আমরা ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছি।
“আলোচনায় আমরা বাস্তবায়ন শুরু না হওয়া যৌক্তিকভাবে কিছু প্রকল্প বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি। তারাও আমাদের সাথে একমত পোষণ করেছেন।”
তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমরা দুপক্ষ মিলে প্রকল্প তালিকা যৌক্তিক করার জন্য একটা টেকনিক্যাল কমিটি করেছি। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া ইআরডির একজন কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের অন্তত ১১টি প্রকল্প বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এরমধ্যে দ্বিতীয় এলওসি থেকে প্রায় ৭০ কোটি ডলার প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৫টি এবং দ্বিতীয় এলওসির অধীনে তালিকাভুক্ত প্রায় ১৮১ কোটি ডলার ব্যয়ের ৬টি প্রকল্প রয়েছে।
বাদ পড়ছে যেসব প্রকল্প
দ্বিতীয় এলওসির ৫টি
‘কনস্ট্রাকশন অব ডাবল লাইন ট্র্যাক খুলনা-দর্শনা সেকসন অব বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রজেক্ট। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩১ কোটি ২৪ লাখ ডলার।
‘কনভারশন অব মিটারগেজ লাইন টু ডুয়েল গেজ লাইন ইন পার্বতীপুর-কুষ্টিয়া প্রজেক্ট’। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ কোটি ডলারের কিছু বেশি।
‘কনস্ট্রাকশন অব নিউ ক্যারেজ ওয়ার্কশপ সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়র্কশপ, প্রজেক্ট। এর ব্যয় ধরা হয় ৭ কোটি ডলার।
‘ইন্ডিয়ান ইকোনমিক জোনস, মংলা প্রজেক্ট। এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর’ প্রজেক্ট, ব্যয় ধরা হয় ১৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
তৃতীয় এলওসির ৬টি
‘কনস্ট্রাকশন অব নিউ ডুয়েলগেজ রেললাইন ফ্রম বগুড়া টু শহীদ এম মন্সুর আলী স্টেশন (সিরাজগঞ্জ) অব বাংলাদেশ রেলওয়ে’। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭ কোটি ৯২ লাখ ডলার।
‘রেল অ্যান্ড রোড বেইজড আইসিডি অ্যাট ঈশ্বরদী’ প্রজেক্ট। এর ব্যয় ধরা হয় ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
‘বেনাপোল-যশোর-নড়াইল-ভাটিয়াপাড়া-ভাঙ্গা রোডস প্রজেক্ট’। এর ব্যয় ধরা হয় ১০ কোটি ডলার।
‘পায়রা পোর্ট মাল্টিপারপাস টার্মিনাল প্রজেক্ট’। এর ব্যয় ধরা হয় ৫২ কোটি ৫৮ লাখ ডলার।
‘বে কন্টোইনার টার্মিনাল (চট্টগ্রাম) প্রজেক্ট। এর ব্যয় ধরা হয় ৪০ কোটি ডলার।
‘সৈয়দপুর এয়ারপোর্ট প্রজেক্ট’। এর ব্যয় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার ধরা হয়।