Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে যে পরিমাণ ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেল

শুক্রবার সকালে ভূমিকম্পের পরই হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে হতাহতের খবর আসতে শুরু করে
শুক্রবার সকালে ভূমিকম্পের পরই হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে হতাহতের খবর আসতে শুরু করে
[publishpress_authors_box]

ছুটির দিনের সকালে অনেকেই যখন হালকা মেজাজে ঘরে শুয়ে-বসে আছেন, ঠিক তখনই ভয়াবহ কাঁপুনি টের পেতে শুরু করেন তারা। কয়েক সেকেন্ডের ভূমিকম্পে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে।

বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, শুক্রবার রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী জেলা শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে এবং ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এই ভূমিকম্প গত কয়েক দশকে দেশের ভেতরে উৎপত্তি হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল।

এর আগে সিলেট, নোয়াখালী অঞ্চলে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। তবে এবার ভূমিকম্পের কেন্দ্র ঢাকার আরও কাছে নরসিংদীতে। এর আগে ঢাকার এত কাছে এই মাত্রার ভূমিকম্প উৎপত্তি হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলছেন, “বাংলাদেশের মধ্যে টেকটোনিক প্লেটের যে পাঁচটি সোর্স আছে তার মধ্যে নোয়াখালী থেকে শুরু করে কক্সবাজার, নোয়াখালী থেকে সিলেট এবং আরেকটি সিলেট থেকে ভারতের দিকে চলে গেছে।”

নোয়াখালী থেকে সিলেট, এই অংশে যে বড় ফাটল রয়েছে তারই একটি ছোট অংশ নরসিংদী, এর ফলে নরসিংদী এলাকায় ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হওয়া অস্বাভাবিক নয় বলেও মনে করেন মেহেদি আহমেদ আনসারী।

ভূমিকম্পের সময় আঘাত পেয়ে ঢাকায় চার জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে

প্রাণহানি আহত

ভূমিকম্পের পর থেকে শুক্রবার রাত পর্যন্ত ধীরে ধীরে মৃতের সংখ্যা বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

সকালে ভূমিকম্পের পরই হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে হতাহতের খবর আসতে শুরু করে।

জেলা প্রশাসনের সূত্র দিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, ঢাকায় চারজন, ভূমিকম্পে কেন্দ্রস্থল নরসিংদীতে পাঁচ জন এবং নারায়ণগঞ্জে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এ পর্যন্ত সাড়ে চারশ জনেরও বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর পেয়েছেন বলে সন্ধ্যায় বিবিসি বাংলাকে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে সরকার।

এর মধ্যে গাজীপুর জেলায় ২৫২ জন আহত হয়েছেন এবং একক জেলা বিবেচনায় এই সংখ্যা সব থেকে বেশি বলেও তিনি জানান।

নিতাই চন্দ্র দে সরকার বলেন, “এই মুহূর্তে হতাহত এবং ক্ষতিক্ষতি নিরূপণ করাই আমাদের প্রধান কাজ। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার বা ডেবরিস ম্যানেজমেন্টের চ্যালেঞ্জটা আমরা এখনও ওই মাত্রায় দেখছি না।”

ঢাকায় নিহতদের বিষয়ে জানা যায়, ভূমিকম্পের সময় পুরান ঢাকার আরমানিটোলার কসাইটুলি এলাকার একটি আটতলা ভবনের পাশের দেওয়াল এবং কার্নিশ থেকে ইট ও পলেস্তরা নিচে খসে পড়ে। এসময় ভবনের নিচে থাকা একটি গরুর মাংসের দোকানে থাকা ক্রেতা ও পথচারীরা আহত হন।

ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় লোকজন তাদের মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢাকার মুগদা মদিনাবাগে নির্মাণাধীন ভবনের রেলিং ধসে পড়ে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী মাকসুদ (৫০) নিহত হয়েছেন। তার বাড়ি লক্ষীপুর জেলার রামগতি উপজেলায়।

এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় ভবন থেকে নামার সময় বা লাফিড়ে পড়ে অনেকের আহত হওয়ার খবরও এসেছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকায় দেওয়াল ধসে একটি শিশু ঘটনাস্থলে মারা যায়, তার মায়ের অবস্থাও গুরুতর বলে জানায় জেলা প্রশাসন।

ওই জেলায় ২৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন বলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে পাঁচ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

ভূমিকম্পের “মাত্রা অনুযায়ী হতাহতের সংখ্যা কিছুটা বেশি হয়েছে” বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। আহতদের বেশিরভাগেরই ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হয়েছে বলে জানান তিনি।

ভূমিকম্পের পর অনেকে আতঙ্কে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন

অবকাঠামোর ক্ষতি

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বলছে, এখনও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য হিসাব করছে তারা।

বিচ্ছিন্নভাবে জেলাগুলো থেকে ভূমিকম্পের কারণে ভবনে ফাটলের কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ঢাকায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের একটি তালিকা দিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস। যেখানে রাজধানীর ১৪টি এলাকায় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর জানানো হয়েছে।

শুক্রবার রাতে ঢাকা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার মো. সালাহ উদ্দীন-আল-ওয়াদুদের স্বাক্ষর করা একটি বার্তায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের প্রাথমিক তালিকায় উল্লেখ করা হয়, রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরী পাড়া, আরমানিটোলা, সূত্রাপুর, বনানী ও কলাবাগানসহ মোট ১৪টি এলাকায় ১৪টি ভবন সকালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নরসিংদী জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও সার্কিট হাউসহ শতাধিক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে বলে সেখানকার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।

গাজীপুরে গার্মেন্ট কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ভূমিকম্পের সময় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে শতাধিক আহতের খবর পাওয়া গেলেও অবকাঠামোগত ক্ষতির কোনও তথ্য পায়নি স্থানীয় প্রশাসন।

স্থানীয় গণমাধ্যমে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় ভবন হেলে পড়া বা ফাটল দেওয়া দেওয়ার খবর প্রচার করা হচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সমন্বিত কোনও তথ্য রাত নাগাদ দেওয়া হয়নি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে একটি কন্ট্রোল রুম ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের বিষয়ে কাজ করছে এবং তথ্য দেওয়ার জন্য একটি টেলিফোন নম্বরে (০২৫৮৮১১৬৫১) সবাইকে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

ভূমিকম্পে বেশ কিছু বিদ্যুতের খুঁটি হেলে পড়ে এবং ঘোড়াশাল গ্রিডে সরবরাহ বন্ধ হয়ে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

ভূমিকম্পে ঢাকা ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলায় ভবনে ফাটল দেখা দেওয়া ও হেলে পড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে

বড় দুর্যোগের সতর্কবার্তা?

“বড় ভূমিকম্প আসার আগে ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, এটি তার আগাম বার্তা,” এমনটা মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারী।

মেহেদি আহমেদ আনসারী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, সাধারণত একশ থেকে দেড়শ বছর পরপর একটি অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার শঙ্কা থাকে। বাংলাদেশ ও এর আশপাশের কাছাকাছি এলাকায় গত দেড়শ বছরে একটি বড় ও প্রায় পাঁচটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে।

বাংলাদেশের আশপাশে সবশেষ বড় ভূমিকম্প সংগঠিত হয়েছিল প্রায় একশ বছর আগে। তাই আরেকটি বড় ভূমিকম্প কাছাকাছি সময়ে হতে পারে এমন শঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মেহেদি আহমেদ আনসারী বলছেন, “বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন তৈরি করলে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হবে এটিই স্বাভাবিক। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় শহরগুলোতে অপরিকল্পিতভাবে যে ভবনগুলো গড়ে তোলা হচ্ছে তাতে ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা বেড়েই চলেছে, বলেন তিনি।

একই ধরনের বক্তব্য এসেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের কাছ থেকেও। এই ভূমিকম্পকে ‘বাংলাদেশের জন্য একটা সতর্কবার্তা’ বলে মনে করছেন তিনি।

শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন ভবনে বিল্ডিং কোড মানা হলেও যে ভবনগুলো আগে তৈরি করা সেগুলোর বেশিরভাগই কোনও নিয়ম মেনে নির্মিত হয়নি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত