Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

রাজস্ব আদায় : এবারও বড় ঘাটতির শঙ্কা

এনবিআর
ঢাকার আগারগাঁওয়ে এনবিআর ভবন। ছবি : সকাল সন্ধ্যা
[publishpress_authors_box]

রাজস্ব আদায়ে গতি ফেরেনি; বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গত বছরের আগস্টে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি, নানা অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় ব্যবসা-বাণিজ্যে শ্লথগতি দেখা দিয়েছিল।

তার প্রভাব পড়েছিল শুল্ক-কর আদায়ে। প্রায় লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৪-২৫ অর্থ বছর। এবারও সেই বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়তে যাচ্ছে এনবিআর।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম চার মাসেই (জুলাই-অক্টোবর) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি ১৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর আগে চার মাসে রাজস্ব আদায়ে এত ঘাটতির মুখে পড়েনি এনবিআর।

বৃহস্পতিবার রাজস্ব আদায়ের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে এনবিআর। সেখানে দেখা গেছে, গত জুলাই-অক্টোবর সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা।

এ হিসাবে অর্থ বছরের এই চার মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকা।

চলতি অর্থ বছর এনবিআরকে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।

বড় ঘাটতির মধ্যেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম চার মাসে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ দশমিক ৫৪ বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জুলাই-অক্টোবর ১ লাখ ৩ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছিল।

আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। চার মাসে ঘাটতি হয়েছে ৯ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪৭ হাজার ৪৩ কোটি টাকা; আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।

আমদানি খাতে চার মাসে ৪১ হাজার ৫০৭ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৪ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। এই খাতে ঘাটতি হয়েছে ৬ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা।

জুলাই-অক্টোবরে ভ্যাট বা মূসক আদায়েও লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এই খাতের লক্ষ্য ছিল ৪৮ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা। ভ্যাট আদায় হয়েছে ৪৬ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা।

এনবিআরের কর্মকর্তা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথগতি থাকায় রাজস্ব আদায় তুলনামূলক কম হয়েছে। তবে বছরের শেষ দিকে রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়বে বলে মনে করেন তারা। তারা বলেন, করের আওতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধার করার কাজ করছে এনবিআর।

রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি নিয়ে গত অর্থ বছর শেষ হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক অর্থ বছরে রাজস্ব আদায়ে এমন বিশাল অঙ্কের ঘাটতির মুখে পড়েনি এনবিআর।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি (৪.৭ বিলিয়ন) ডলার ঋণের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। আইএমএফের এমন শর্তের মুখেও গত অল্থ বছরে বিশাল ঘাটতিতে পড়ে এনবিআর।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কারণে গত অর্থ বছরের প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় অচল ছিল। আবার বছরের শেষ মাস জুনে এনবিআরের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দেয়।

২০২৪-২৫ অর্থ বছরে সব মিলিয়ে এনবিআরের শুল্ক, ভ্যাট ও কর বিভাগ আদায় করে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। এনবিআরের সংশোধিত লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আয়করে বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৪২ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা ঘাটতি হয়।

গত অর্থ বছরে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ার প্রধান দুটি কারণ ছিল জুলাই আন্দোলন এবং এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন। এই দুটি নতুন কারণ। এ ছাড়া এনবিআরে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া; কর জাল বৃদ্ধি না পাওয়া, কর কর্মকর্তাদের সক্ষমতার অভাব, শুল্ক-কর ফাঁকি, পর্যাপ্ত অটোমেশন না হওয়া—এসব পুরোনো কারণ তো ছিলই। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে করদাতাদের হয়রানি এবং ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগও আছে।

গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র–জনতার আন্দোলন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। অফিস আদালত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা যায়নি। এ ছাড়া আন্দোলনের সময় বেশ কয়েক দিন কারফিউ ছিল। এসব কারণে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হয়নি। এ ছাড়া বছরজুড়ে একধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতাও ছিল।

অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা এখনও কাটেনি। আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। উল্টো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফাঁসির রায়কে ঘিয়ে গণপরিবহনে আগুন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ককটেল ফাটানোসহ নানা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড জনমনে ভীতি সঞ্চার হয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরেও আছে অনিশ্চয়তা।

সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে গত অর্থ বছরের মতো এবারও রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।

সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে গত অর্থ বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ঘাটতি ছিল। সেই পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। নির্বাচন নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে অনেকের মনে। একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ছাড়া দেশে স্থিতিশীলতা আসবে বলে মনে হয় না। সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্যে ফিরে আসবে না। আর নির্বাচন হলে, নতুন সরকার আসলে দায়িত্ব বুঝে নিতে, কাজ শুরু করতে এই অর্থ বছর প্রায় শেষ হয়ে যাবে। সে কারণে আমার মনে হয়, গত বারের মতো এবারও আমরা রাজসব আদায়ে বড় ঘাটতির মুখে পড়তে যাচ্ছি।”

চার মাসের কোনো মাসেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি

চলতি ২০২৫-২৫ অর্থ বছরের চার মাসের (জুলাই-অক্টোবর) কোনো মাসেই রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি এনবিআর। প্রথম মাস জুলাইয়ে লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ১১১ কোটি টাকা; আদায় হয় ২৭ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। ঘাটতি ২ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা।

দ্বিতীয় মাস আগস্টে লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। আদায় হয়ে ২৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। ঘাটতি হয়েছে ৩ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা।

সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩৮ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৩৬ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। ২ হাজার ৩২২ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।

সবশেষ চতুর্থ মাস অক্টোবরে ৮ হাজার ৩২০ কোটি ৬ লাখ টাকা। এই মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। আদায় হয়েছে ২৮ কোটি ৪৭৩ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে জুলাই-অক্টোবর চার মাসে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি ৭ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত