বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের কথা উঠলে সাধারণ মানুষের মনের ক্যানভাসে প্রথমেই ভেসে ওঠে তৈরি পোশাকের কথা। মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। তারপর পাট, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত চিংড়ি কিংবা চামড়াজাত পণ্যের কথা আসে।
কিন্তু ওষুধশিল্প নীরবে-নিভৃতে যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে…; প্রতিবছরই এই খাত থেকে রপ্তানি আয় বাড়ছে— তা মানুষের কাছে সর্বাংশে দৃশ্যমান হয়নি। সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কা, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হবে কিনা— তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যে আশার আলো ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০১০-১১ অর্থ বছরে ওষুধ রপ্তানি করে মাত্র ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে ১৫ বছরের ব্যবধানে গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে সেই আয় পাঁচ গুণের বেশি বেড়ে ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলারে ওঠে, যা ছিল ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের ২০ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ডলরের চেয়ে প্রায় ৪ শতাংশ বেশি।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী (প্রতি ডলার ১২২ টাকা) টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এক আর্থিক বছরে ওষুধ রপ্তানি করে এত বিদেশি মুদ্রা দেশে আসেনি।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরেও সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, এই আর্থিক বছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করে ৭ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার আয় করেছেন এ খাতের রপ্তানিকারকরা। এই অঙ্ক গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এই চার মাসে আয়ের অঙ্ক ছিল ৬ কোটি ৯৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার।
ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানিতে সাফল্য থাকলেও এ খাতের কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় উন্নতি করতে পারলে ওষুধশিল্প দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি পণ্য খাত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন এ খাতের রপ্তানিকারকরা।
বর্তমানে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হচ্ছে চামড়া। গত অর্থ বছরে এই খাত থেকে ১১৪ কোটি ৫০ লাখ ৭০ হাজার (১.১৪ বিলিয়ন) ডলারের বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছিল।
দেশে ওষুষের কাঁচামাল তৈরির ব্যবস্থা করা গেলে পাঁচ বছরের মধ্যে এই খাত থেকে আয় ৫ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “অনেক দেশের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় বাংলাদেশ দ্রুত ভালোমানের ও কম দামের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।”
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি বলেন “সবচেয়ে বড় কথা— ৪৮টি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মধ্যে বাংলাদেশই ওষুধ উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের ১০টি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। খুব শিগগিরই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০টি হবে।
“আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে কাঁচামাল। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য যে এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট) পার্ক তৈরি করা হচ্ছে, সেটা পুরোদমে চালু হলে সেখানে কাঁচামাল তৈরি করা হবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অনেকে কারখানা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। এখানে কাঁচামাল উৎপাদন শুরু হলে দেশের ওষুধশিল্প আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।”
তবে ওষুধের কাঁচামাল তৈরির এই পার্কটি দেড় দশকের বেশি সময়েও দাঁড়াতে পারেনি। এ শিল্পের জন্য বরাদ্দ জমি ফাঁকা পড়ে আছে। চাহিদার ৯৫ শতাংশ ওষুধ দেশে তৈরি হলেও এর কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর।
১৭ বছর আগে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় এ শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য জমি বরাদ্দ দিয়েছিল সরকার। সেখানে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল উৎপাদন শুরু করেছে। দুটি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। ২৩টি প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ জমি ফাঁকা পড়ে আছে।
সাধারণত ওষুধে দুই ধরনের উপাদান থাকে। একটি হলো মূল কাঁচামাল অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই)। অন্যটি হলো সহযোগী নিষ্ক্রিয় উপাদান (এক্সিপিয়েন্ট)। যেমন –প্যারাসিটামল বড়ির এপিআইয়ের নাম ‘প্যারাএসাইটাল অ্যামাইনোফেনাল’। এটা মানুষের শরীরে কাজ করে, রোগ সারায়। কিন্তু প্যারাসিটামল বড়িতে সেলুলোজ, ট্যাল্কসহ কিছু উপাদান থাকে। এগুলো হলো—এক্সিপিয়েন্ট; যা এপিআইকে বড়ির আকার দিতে, বড়ি মানুষের শরীরে দ্রুত দ্রবীভূত হতে সহায়তা করে। তবে এক্সিপিয়েন্ট শরীরে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখায় না।
ওষুধশিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রতিবছর অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার এপিআই আমদানি করে। ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে এপিআই আমদানি খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি এপিআই উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়বে।
ওষুধশিল্পে বাংলাদেশের অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ব্যবহৃত ওষুধের ৯৫ শতাংশ দেশেই তৈরি হয়, প্রয়োজনের ৫ শতাংশ শুধু আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানিও করে। এত সবের পরও ওষুধের ৯০ শতাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। মাত্র ১০ শতাংশ কাঁচামাল বা এপিআই দেশে তৈরি হয়।
বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো চীন ও ভারত থেকে বেশি এপিআই আমদানি করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সঠিক পদক্ষেপ নিলে ওষুধের কাঁচামাল আমদানি কমানো সম্ভব।
গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস ১৯৮৮ সালে দেশে প্রথম এপিআই তৈরি শুরু করে। তাদের প্রথম এপিআই ছিল এমোক্সসিলিন। এটি অ্যান্টিবায়োটিক। এরপর গণস্বাস্থ্য আরও দুটি এপিআই তৈরি করে।
এরপর থেকে অগ্রগতি তেমন হয়নি। দেশের ছোট ও বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো একটি বা দুটি করে এপিআই তৈরি করেছে। তবে যে ধরনের নীতি সহায়তা ও আর্থিক প্রণোদনা দরকার, তা ওষুধ কোম্পানিগুলো পায়নি।
এপিআই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএআইএমএ) বলছে, গত আট বছরে স্থানীয় ওষুধ কোম্পানি ৪০টির বেশি এপিআই তৈরি করেছে। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান নিজে এপিআই তৈরি করে নিজের ওষুধ কোম্পানিতে তা কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে। কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান এপিআই তৈরি করে দেশের মধ্যে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে। দেশি কোম্পানিগুলো আর্থিক নিরাপত্তা ও প্রণোদনা পেলে দেশের প্রয়োজনের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এপিআই দেশেই তৈরি সম্ভব।
বিআইএমএর সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর—প্রতিটি দেশ এই শিল্পকে নিরাপত্তা দিয়েছে, ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিয়েছে। আমাদের তা দিতে হবে। পাশাপাশি নমুনা পরীক্ষা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। ওষুধশিল্পের যে অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আছে, তা এই শিল্পকে দৃঢ় ভিত্তি দিতে সহায়তা করবে।”
বাংলাদেশে ওষুধ খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তির আছে। এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় দুই লাখ ও পরোক্ষভাবে আরও তিন লাখ মানুষের কাজের সুযোগ হয়েছে।
গত ১৫ বছরে স্থানীয় বাজার বেড়েছে তিনগুণ। ২০১০ সালে এই বাজার ছিল নয় হাজার কোটি টাকার। এখন তা ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। জেনেরিক ওষুধের বৈশ্বিক বাজার প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারের।
ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি আবদুল মুক্তাদির বলেন, “বিশ্ববাজারের এক শতাংশও যদি আমরা রপ্তানি করতে পারি তাহলে আমাদের রপ্তানি ৪০০ কোটি (৪ বিলিয়ন) ডলার বাড়িয়ে দিতে পারে। চীন, ভারত ও পশ্চিমের কয়েকটি দেশ ছাড়া ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশের সমকক্ষ কেউ নেই। ফলে বৈশ্বিক ওষুধের বাজারে আমাদের ব্যাপক প্রবৃদ্ধির সুযোগ আছে।”
স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে বাংলাদেশ। তুলনামূলক সমৃদ্ধ এসব দেশ তাদের জাতীয় চাহিদার ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভর করে।
১৫ বছরের রপ্তানির চিত্র
ঔষধ শিল্প সমিতির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে। গত দুই বছরে ১২০০টি ওষুধপণ্য রপ্তানির জন্য নিবন্ধন পেয়েছে। বর্তমানে সেগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশসহ ১৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন ক্রমবর্ধমানভাবে বড় বাজারগুলো— যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থ বছরে ওষুধ রপ্তানি করে মাত্র ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে সেই প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে ২১ কোটি ৩১ লাখ ৬০ হাজার ডলার হয়েছে।
এই ১৫ বছরে শুধু এক বছর ছাড়া সব অর্থ বছরেই রপ্তানি বেড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১৩ কোটি ডলার। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে তা বেড়ে হয় ১৩ কোটি ৫৮ লাখ ডলার।
২০২০-২১ অর্থ বছরে আরও বেড়ে ১৬ কোটি ৯০ লাখ ২০ হাজার ডলারে ওঠে। ২০২১-২২ অর্থ বছরে ওষুধ রপ্তানি থেকে আসে ১৮ কোটি ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ডলারের বিদেশি মুদ্রা।
পরের বছরে অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থ বছরে অবশ্য ৭ শতাংশ কমে যায়; আয় হয় ১৭ কোটি ৫৪ লাখ ২০ হাজার ডলার।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ওষুধ রপ্তানি থেকে প্রথমবারের মতো ২০ কোটি ডলারের বেশি আয় হয়; আসে ২০ কোটি ৫৪ লাখ ৮০ হাজার ডলারের বিদেশি মুদ্রা। প্রবৃদ্ধি হয় ১৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এ সময়ে প্রতিবছরেই জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পণ্য রপ্তানি থেকে বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছে। তবে, ২০১৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে ছাড় (মেধাস্বত্ব অধিকার-ট্রিপস) দেওয়ার পর এ খাতের রপ্তানির পালে হাওয়া লাগে। করোনা চিকিৎসার ওষুধ রপ্তানি করে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে বাংলাদেশের ওষুধ; কুড়িয়েছে সুনাম।
২০২৬ সালের পর কী হবে
ওষুধ খাতে রপ্তানি আয় বেড়ে চললেও ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হলে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে ছাড় পাওয়ার সুবিধা আর থাকার কথা নয়। বর্তমান ট্রিপস সুবিধার আওতায় বাংলাদেশের ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বের জন্য কোনও ব্যয় না করেই ওষুধ তৈরি ও কেনা-বেচা করার সুযোগ পাওয়ার কথা রয়েছে।
এলডিসি থেকে বের হলেও বাংলাদেশ যাতে এই সুবিধা পায়, সে জন্য ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে জোর প্রচেষ্টা চালানো হয়।
গত আট বছরের নানা প্রক্রিয়া ও একাধিক মূল্যায়ন শেষে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বের হবে বাংলাদেশ— এমন সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের। সেই হিসাবে এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের সামনে সময় আছে এক বছরের কিছুটা বেশি। এই সময়ে এসে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, এই মুহূর্তে এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে রপ্তানি খাতসহ নানা খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আগামী বছর এলডিসি তালিকা থেকে বের হলে সঙ্কট তৈরি হবে। এমন উদ্বেগ জানিয়ে এলডিসি থেকে উত্তরণ ২০২৬ সাল থেকে পিছিয়ে ২০৩২ সালে নির্ধারণের দাবি জানিয়ে সরকারের কাছে সম্প্রতি চিঠি দেয় শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংগঠনগুলো। ব্যবসায়ীদের এ উদ্বেগ জাতিসংঘকে জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে জাতিসংঘকে বিষয়টি নিয়ে স্বাধীন মূল্যায়নের অনুরোধ করা হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দিতে জাতিসংঘকে অনুরোধ জানানো হয়নি।
গত ২৪ আগস্ট ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, আইসিসি বাংলাদেশসহ ১৬ ব্যবসায়ী সংগঠন একযোগে সংবাদ সম্মেলন করে এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি করে। পরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে সরকারের জরুরি উদ্যোগ চায় এসব সংগঠন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার জাতিসংঘকে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের এই দাবির পর এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি নতুন করে আবারও আলোচনায় এসেছে। এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানো কতটা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে নানা মতামত দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সময় বৃদ্ধির আবেদন করার জন্য কী কী যৌক্তিক কারণ আছে, সরকার চাইলেই কি সময় পেছাতে পারবে— এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে। কারণ, গত মার্চে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের এ অনুরোধে সাড়া দিয়ে পর্যালোচনা করতে জাতিসংঘের একটি প্রতিনিধিদল গত ৯ নভেম্বর বাংলাদেশ সফরে এসেছে। জাতিসংঘের হাই রিপ্রেজেনটেটিভের কার্যালয়ের পরিচালক রোনাল্ড মোলেরুসের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করবে। আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিনিধিদলটি একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরামর্শভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করবে।
গত ১০ নভেম্বর প্রতিনিধিদলের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, এলডিসি থেকে বের হলে সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। ওষুধ শিল্পের ওপর মেধাস্বত্ব বিধিবিধান আরও কড়াকড়ি হবে। উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বড় বড় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। ফলে রপ্তানি ৬ থেকে ১৪ শতাংশ কমে যেতে পারে।
দেশের অন্যতম বড় ওষুধ কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার রাব্বুর রেজা এবং বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের গ্লোবাল বিজনেসের পরিচালক মনজুরুল আলম অবশ্য আশা করছেন, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হলেও ওষুধের ট্রিপস সুবিধা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।
রাব্বুর রেজা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমাদের বিশ্বাস একটা ভালো সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে ডব্লিউটিও। সে ক্ষেত্রে, আমাদের দেশের ওষুধশিল্প ও রপ্তানিতে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।”
আগামী দিনগুলোতে ওষুধ রপ্তানি আরও বাড়বে বলে আশার কথা শোনান তিনি।
মনজুরুল আলম বলেন, “ওষুধ খাতের রপ্তানি বাজার খুবই উজ্জ্বল বলে আমি মনে করি। গত অর্থ বছরে আমাদের ওষুধের প্রচুর অর্ডার ছিল, কিন্তু আমরা দিতে পারিনি। দেশের চাহিদা মিটিয়েছি।”
তিনি বলেন “ট্রিপস নিয়ে আমরা মোটেই চিন্তিত নই। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের এই খাত এখন এমন শক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে, বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি আমাদের এখানে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসবে। সে কারণে ট্রিপস সুবিধা উঠে গেলেও বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের কোনও সমস্যা হবে বলে আমি মনে করি না।”



