সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তবে এখনও তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এগুলো হলো—দুর্বল কর রাজস্ব ব্যবস্থা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এই দুর্বলতাগুলো সমাধান করা করা গেলে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) অর্জিত হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আইএমএফ বৃহস্পতিবার রাতে একটি বিবৃতি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। সেখানে এসব কথা বলা হয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর—আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে সফর করেছে। এই দলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির গবেষণা শাখার উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও। সফরকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও আর্থিক নীতি নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিনিধিদলটি।
সফরকালে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
বিবৃতিতে ক্রিস পাপাজর্জিও বলেছেন, “বাংলাদেশ সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সংস্কার কার্যক্রম অগ্রসর করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে দুর্বল কর রাজস্ব, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে দেশটির অর্থনীতি এখনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।”
“রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সমস্যা মোকাবিলায় সাহসী নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। যাতে টেকসই আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা যায়। ঝুঁকিও এখনো প্রবল। বিশেষ করে যদি নীতি প্রণয়নে বিলম্ব হয় কিংবা অপর্যাপ্ত নীতি গ্রহণ করা হয়, তাহলে ঝুঁকি থাকবে।”
পাপাজর্জিও বলেন, “মধ্য মেয়াদে শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা, যুব বেকারত্ব হ্রাস এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনাকে বাড়াবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।”
আইএমএফের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রশংসনীয় অগ্রগতি করেছে। তবে দুর্বল কর রাজস্ব এবং আর্থিক খাতের মূলধন ঘাটতির কারণে এখনো আর্থিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। এর কারণ, গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের কারণে উৎপাদনে বিঘ্ন হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। যাতে সহজ, ন্যায্য ও কার্যকর রাজস্ব পরিবেশ গড়ে ওঠে এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতাগুলো সমাধান করা যায়।
“এসব নীতি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি হবে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরেও ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হব্যে। তবে মূল্যস্ফীতি কমে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসবে,” বিবৃতিতে বলেন আইএমএফ কর্মকর্তা ক্রিস পাপাজর্জিও।
গত ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটির ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ বা ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে বাংলাদেশের ৪ দশমিক ৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার এই আর্থিক বছরে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরেছে।
গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বাংলাদেশের ৪ দশমিক ২২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের চতুর্থ মাস অক্টোবরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) বাংলাদেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।
আগের মাস সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
ব্যাংক খাত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি
ব্যাংক খাত নিয়ে আইএমএফের বিবৃতিতে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানে আর্থিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। দুর্বল ব্যাংকগুলো চিহ্নিত করে একটি বিশ্বাসযোগ্য কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। সেখানে মূলধন ঘাটতি, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা, আইনি কাঠামোয় পুনর্গঠন এবং অর্থের উৎস নির্ধারণ করা থাকবে।
“এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্পদ মান পর্যালোচনা প্রয়োজন। ব্যাংক পরিচালনা, স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।”
আইএমএফের সহায়তা কর্মসূচির পঞ্চম পর্যালোচনা আলোচনা ভবিষ্যতেও চলবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়। বাংলাদেশের জনগণের জন্য টেকসই সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার প্রয়াসে আইএমএফ অংশীদার হিসেবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
আইএমএফের দলটি সফরকালে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।


