Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে তীব্র গোলাগুলি কেন, যা জানা গেল

POK
[publishpress_authors_box]

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্তে তালেবান ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে তীব্র গোলাগুলি হয়েছে। গত সপ্তাহে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে এক বিমান হামলার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরান, কাতার ও সৌদি আরব উভয়পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।

টোলোনিউজ জানিয়েছে, চলমান সীমান্ত সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছে। বাহরামচা জেলার শাকিজ, বিবি জানি ও সালেহান এলাকার পাশাপাশি পাকতিয়া প্রদেশের আরিউব জাজি জেলাজুড়ে তীব্র লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো টোলোনিউজকে আরও জানিয়েছে, পাকতিয়া প্রদেশের আরিউব জাজি জেলাতেও সংঘর্ষ শুরু হয়েছে, যা ছড়িয়ে পড়েছে স্পিনা শাগা, গিওয়ি, মানি জাবহা ও বিতর্কিত সীমান্তের পার্শ্ববর্তী অন্যান্য এলাকাতেও।

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এনায়তুল্লাহ খাওয়ারিজমি শনিবার রাতে এক বিবৃতিতে বলেন, তালেবান বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে “সফল পাল্টা হামলা” চালিয়েছে। প্রতিবেশী দেশটির “বারবার সীমান্ত লঙ্ঘন” ও আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলার” জবাবে এই পাল্টা হামলা করা হয়েছে।

তিনি সোশাল মিডিয়া ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে জানান, অভিযানের সমাপ্তি ঘটেছে মধ্যরাতে।

বিভিন্ন প্রদেশের জ্যেষ্ঠ তালেবান কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, তালেবান বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তারা দাবি করেছে, দক্ষিণ হেলমান্দ প্রদেশে পাকিস্তানের দুটি সীমান্তচৌকি তারা দখল করেছে। স্থানীয় প্রশাসনও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি আফগান বাহিনীর হামলাকে “অপ্ররোচিত” বলে আখ্যা দেন এবং জানান, পাকিস্তানি বাহিনী “প্রতিটি ইটের জবাব একটি পাথর দিয়ে দিচ্ছে”।

তিনি এক্সে লেখেন, “আফগান বাহিনীর বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালানো আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন। পাকিস্তানের বীর সেনারা দ্রুত ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং জানিয়ে দিয়েছে যেকোনো ধরনের উসকানি সহ্য করা হবে না।”

রেডিও পাকিস্তান নিরাপত্তা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, সীমান্ত বরাবর ছয়টি স্থানে হামলা চালিয়েছে আফগান বাহিনী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই হামলার জবাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী “তীব্র ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া” জানায় এবং রাতের আকাশ আলোকিত করে তোলা বন্দুক ও কামানের গুলির ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে।

তবে সংঘর্ষ শেষ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

এই সংঘর্ষটি এমন সময়ে ঘটছে, যখন কয়েকদিন আগেই আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে এক বিমান হামলায় বিস্ফোরণ ঘটে। এর জন্য তালেবান পাকিস্তানকে দায়ী করেছে।

ইসলামাবাদ বৃহস্পতিবারের ওই হামলার দায় স্বীকার করেনি।

তবে পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, আফগান তালেবান প্রশাসন পাকিস্তানি তালেবান যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে। তারা ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালায়।

নয়াদিল্লি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে তালেবান জানিয়েছে, তারা তাদের ভূখণ্ডকে অন্য কোনও দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে দেয় না।

বর্ধমান এই উত্তেজনা আঞ্চলিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দুই প্রতিবেশী দেশকে “সংযম প্রদর্শন” করার আহ্বান জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক সরাসরি সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, “আমাদের অবস্থান হলো উভয় পক্ষকেই সংযম প্রদর্শন করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “দুই দেশের মধ্যে স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখে।”

কাতারও এই পরিস্থিতিতে “গভীর উদ্বেগ” প্রকাশ করেছে এবং “এটি অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব ফেলতে পারে” বলে মন্তব্য করেছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে আরও জানায়, “উভয় পক্ষকেই সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, সংযম প্রদর্শন করতে হবে। আর এমনভাবে বিরোধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে যাতে উত্তেজনা কমে, সংঘাত না বাড়ে, এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সহায়তা করে।”

সৌদি আরবও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের, উত্তেজনা এড়ানোর, এবং আলোচনার ও প্রজ্ঞার পথ গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে উত্তেজনা হ্রাস পায় এবং অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।”

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “শান্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি লক্ষ্য করে গৃহীত সব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানায় সৌদি আরব। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে তার অব্যাহত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে, যা ভ্রাতৃপ্রতিম পাকিস্তানি ও আফগান জনগণের জন্য স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি বয়ে আনবে।”

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর ক্রমবর্ধমান সীমান্ত পারের হামলা, আফগানিস্তানে অস্বাভাবিক মাত্রায় পাকিস্তানের বিমান হামলা, এবং তালেবানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া- এই তিনটি বিষয় মিলে এক ভয়াবহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যদি যোগ করা হয় যে, আফগানিস্তান এখনও এই সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয় না এবং একই সঙ্গে চলমান সংকট নিয়ে ভুয়া তথ্যের বিস্তার ঘটে, তাহলে এটি অত্যন্ত অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।”

কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো “আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক হামলাগুলো তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) আরও উসকে দিতে পারে প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে। এর ফলে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ভেতরে আরও তীব্র সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে।”

তিনি বলেন, “এভাবে এই সহিংস চক্রটি আবারও পুনরায় শুরু হতে পারে। এখানে কোনও পক্ষের জন্যই বিজয় বা দীর্ঘমেয়াদি সহজ সমাধান নেই। যদি এখনই উত্তেজনা কমে যায়ও, তবুও আমরা এখনও নিরাপদ অবস্থান থেকে অনেক দূরে।”

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন পুরনো আনুগত্যকে পরীক্ষা করছে এবং নতুন করে সম্পর্কের মানচিত্র আঁকছে। পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান চলতি বছরের শুরুতে এক সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। আফগানিস্তানে দুই দশকের সশস্ত্র বিদ্রোহ চলাকালে যাদের নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে লালন করেছে, সেই তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কও তালেবানদের কাবুলে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তীব্রভাবে অবনতি ঘটেছে। দুই দেশের মধ্যে একাধিক সহিংস সংঘর্ষও ঘটেছে।

দেশের ভেতরে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার পর পাকিস্তান সরকার তীব্র চাপে রয়েছে। সর্বশেষ হামলায় এই সপ্তাহেই ডজনখানেকের বেশি সৈন্য নিহত হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ পুনরায় অভিযোগ করেন যে, আফগানিস্তানে থাকা কিছু সহযোগী পাকিস্তানের ভেতরে জঙ্গিদের অনুপ্রবেশে সহায়তা করছে। সেদিনই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সংসদে বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই একটি প্রতিনিধি দল কাবুলে পাঠানো হবে, যাতে আফগান কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে পাকিস্তানের ভেতরে হামলার জন্য ব্যবহৃত জঙ্গি ঘাঁটিগুলো ভেঙে ফেলার দাবি জানানো যায়।

পাকিস্তান সত্যিই কাবুলে বিমান হামলা চালালে সেটি সম্ভবত তালেবান নেতৃত্বকে বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। আর বার্তাটি হলো, ভারতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা পাকিস্তান কোনোভাবেই সহ্য করবে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত তালেবান সরকারের প্রতি তুলনামূলকভাবে উষ্ণ মনোভাব দেখিয়েছে। তবে ১৯৯০-এর দশকে আফগানিস্তানে তালেবান শাসনামলে এবং পরবর্তী দুই দশকের তালেবান বিদ্রোহের সময়ে, যখন তারা আফগান সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, তখন ভারত-তালেবান সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সতর্ক ও সন্দেহপ্রবণ।

এর একটি কারণ ছিল দুটি ঘটনা, যা এখনও ভারতের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

ভারত অভিযোগ করেছিল, ১৯৯৯ সালে এক ভারতীয় যাত্রীবাহী বিমান অপহরণের পর তালেবান অপহরণকারীদের আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় দিয়েছিল। এছাড়া ২০০৮ সালে কাবুলে ভারতের কূটনৈতিক মিশনে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়, যাতে চারজন ভারতীয় কর্মকর্তাসহ ডজনাধিক মানুষ নিহত হয়। ওই হামলার দায়ও ভারত তালেবানকে দেয়।

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা, নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত