Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

ধর্ষণের প্রতিবাদ ঘিরে উত্তপ্ত খাগড়াছড়িতে নিহত ৩

khagrachari-guimara-clash-280925
[publishpress_authors_box]

এক মারমা কিশোরী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর গত কয়েকদিন ধরেই উত্তেজনা চলছিল খাগড়াছড়িতে; পাহাড়ি সংগঠনগুলো অবরোধ ডাকার পর বাঙালিদের সঙ্গে সংঘর্ষও বাধে। এরপর প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে নিহত হয়েছে তিনজন।

খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় রবিবার এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। এতে তিনজন পাহাড়ি নিহত হওয়ার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সন্ধ্যায় একটি বিবৃতি এসেছে।

তাতে বলা হয়েছে, সংঘর্ষে মেজরসহ ১৩ জন সেনাসদস্য, গুইমারা থানার ওসিসহ তিনজন পুলিশ সদস্য এবং আরও অনেকে আহত হয়েছে।

সংঘর্ষের সময় গুইমারা উপজেলায় মারমাদের রামসু বাজারের বিভিন্ন দোকানপাট ও স্থাপনা জ্ব্ালিয়ে দেওয়া হয়। এজন্য বাঙালিদের দায়ী করছেন পাহাড়িরা। অন্যদিকে বাঙালিরা এই সংঘাতের জন্য সশস্ত্র পাহাড়ি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করছে।

ঘটনার সূত্রপাত

মারমা এক স্কুলছাত্রী গত মঙ্গলবার রাতে প্রাইভেট পড়ে ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার হন। ওই কিশোরীর বাবা মামলা করার পর শয়ন শীল (২১) নামে একজনকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। তাকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে।

এই ধর্ষণের প্রতিবাদে বুধবার ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ আন্দোলন শুরু হয়। সেদিন বিক্ষোভের পর বৃহস্পতিবার আধা বেলা সড়ক অবরোধ করা হয়। শুক্রবার হয় নারী নিপীড়নবিরোধী সমাবেশ।

শনিবার খগড়াছড়িতে সকাল–সন্ধ্যা অবরোধ ডাকে আন্দোলনকারীরা। সেদিন দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে অবরোধকারীদের সঙ্গে স্থানীয় বাঙালিদের ধাওয়া-ধাওয়ি হয়। তাতে কয়েকজন আহত হয়।

এরপর বিকালে জেলা শহরের মহাজন পাড়ায় ফের সংঘর্ষ বাধলে তার জেরে শহরের বিভিন্ন স্থানে দোকানপাট ভাংচুর চলে। গুইমারা উপজেলা সদরেও দেখা দেয় উত্তেজনা।

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন শনিবার বেলা ২টার পর জেলা শহর ও গুইমারায় ১৪৪ ধারা জারি করে।

গুইমারা উত্তপ্ত

স্থানীয় সূত্রের বরাতে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, সকাল থেকে জুম্ম ছাত্র-জনতা ব্যানারে গুইমারায় সড়ক অবরোধ চলছিল। সকাল ১০টার দিকে সেনাসদস্যরা সেখানে গিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে সন্দেহভাজনদের আটকের পরও কেন সড়ক অবরোধ করা হচ্ছে, তা নিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলছিলেন। এরই এক পর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়।

সংঘর্ষের সময় ব্যাপক গুলির শব্দ শোনার কথা জানিয়েছে স্থানীয়রা। অনেক দোকানপাটে আগুন জ্বলতেও দেখা গেছে সোশাল মিডিয়ায় আসা বিভিন্ন ভিডিওতে।

মংসাজাই মারমা ও কংজরী মারমা নামে দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে প্রথম আলো জানিয়েছে, অবরোধকারীদের কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর গুলি চালায়। গুলির পরপরই লোকজন ভয়ে দিগ্‌বিদিক পালিয়ে যায়। এরপর ২০-২৫ জন লোক এসে রামেসু বাজার এবং মারমাদের বসতবাড়িতে লুটপাট করে এবং আগুন ধরিয়ে দেন। এসব লোকের সঙ্গে মুখোশ পরা লোকও ছিল।

মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিলের সভাপতি উয়াফ্রে মারমা বিবিসি বাংলাকে বলেন, “রামসু- মারমাদের বাজার। সেখানে আমাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক গুলি হয়েছে।”

রামসু বাজারে হামলার জন্য ‘সেটেলার’ বাঙালিদের দায়ী করেন তিনি।

সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বাঙালিদের সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল মজিদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড করছে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী গুলো। বাঙালিদের ওপর হামলা হচ্ছে। বাঙালিদের বহু দোকান লুট হয়েছে।”

তবে উয়াফ্রে মারমার দাবি, পাহাড়িদের ওপর হামলা করে উল্টো সেনাসদস্য ও বাঙালিদের ওপর হামলার এ ধরনের অভিযোগ তোলা সেখানকার নিয়মিত ঘটনা।

সংঘর্ষের শুরুতে ‘কয়েকজন সেনা সদস্যের ওপর হামলা হয়েছে’ – এমন একটি খবর সোশাল মিডিয়ায় একটি পক্ষ থেকে প্রচার হয়েছিল।

সহিংসতার খবর শুনে বেলা ৩টার দিকে জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার পুলিশ সুপারকে নিয়ে গুইমারা রওনা হন। তবে সদর থেকে গুইমারার পথে পথে আন্দোলনকারীদের ব্যারিকেড থাকায় সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা সেখানে পৌঁছাতে পারেননি।

তবে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

আন্দোলনকারীদের অবরোধের কারণে জেলা শহরের শহরের অধিকাংশ দোকান রবিবার বন্ধ ছিল। শহরে কোনও ধরনের যানবাহনও চলাচল করেনি।

সরকারের ভাষ্য

গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করলেও কাদের ‍গুলি তাদের মৃত্যুর কারণ, তা বলতে পারেননি ডিআইজি আহসান হাবিব।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিবৃতিতেও তিনজন পাহাড়ি নিহত হওয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বলা হয়, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অতি শিগগির তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনও অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধারণ করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।

খাগড়াছড়িতে এক সভায় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা।

জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে সহিংসতা তৈরি করে একটি পক্ষ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে সুপ্রদীপ বলেন, “আজকে নতুন নতুন ইস্যু তৈরি করে পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলে নির্বাচন দেওয়া। কেউ যদি নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন করে কোনো ইস্যু তৈরি করতে দেওয়া হবে না।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত