গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা নুরুল হক নুরের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলেছে, নৃশংস এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউই ছাড় পাবে না এবং দ্রুততার সঙ্গে এ ঘটনার বিচার সম্পন্ন করা হবে।
বাসস জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে হামলার নিন্দা জানিয়ে শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে একথা বলা হয়েছে।
প্রথম আলো জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও গণ অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। জাপার কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণ অধিকার পরিষদের একটি মিছিল যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটায় গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। গুরুতর আহত নুরুল হকসহ ছয়জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গণ অধিকার পরিষদ বলেছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় জাপার নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান। তবে জাপা বলেছে, মিছিল নিয়ে এসে জাপার নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালান গণ অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়েছে। এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর ৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন।
শনিবার অন্তর্বর্তী সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কেবল নুরের ওপরই নয়, এই ধরনের সহিংসতা ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ঐতিহাসিক সংগ্রামে জাতিকে একত্রিত করা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্পিরিটের ওপরেও আঘাত বলে মনে করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এই নৃশংস ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে সম্পন্ন করা হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রভাব বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, জড়িত কোনও ব্যক্তি জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবে না। স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সঙ্গে এর বিচার সম্পন্ন করা হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তাৎক্ষণিকভাবে নুরুল হক নুর এবং তার দলের অন্যান্য আহত সদস্যদের চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষায়িত মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রয়োজনে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে পাঠানো হবে।
এই সঙ্কটময় সময়ে নুর এবং তার দলের আহত সদস্যরা ও তাদের পরিবারের সঙ্গে পুরো জাতির প্রার্থনা এবং সংহতি রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
২০১৮ সালে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নুরুল হক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন উল্লেখ করে বিবৃতে সরকার বলেছে, “একজন ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি তরুণদের সংগঠিত করেছিলেন, বিভিন্ন মত ও কণ্ঠকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভিকভাবে দাঁড়িয়েছিলেন।
“চব্বিশের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং হেফাজতে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়। নুরের ভূমিকা একটি স্বাধীন, সুষ্ঠু এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য আমাদের জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তার সাহস ও আত্মত্যাগ চিরকাল আমাদের জাতির ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।”
জনবিরোধী সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় আহ্বান জানিয়েছে সরকার।
বিবৃতিতে বলা হয়, “এই সঙ্কটকালীন সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় আহ্বান জানায়। আমাদের সংগ্রামের অর্জন রক্ষা করতে, জনবিরোধী সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে এবং গণতন্ত্রে আমাদের সফল উত্তরণ নিশ্চিত করতে সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়া অপরিহার্য।”
‘জাতীয় নির্বাচন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই’
বিবৃতিতে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা দিয়ে বলা হয়েছে, “অন্তর্বর্তী সরকার দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করছে যে আগামী জাতীয় নির্বাচন যথাসময়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একনিষ্ঠ অঙ্গীকার।
“নির্বাচন বিলম্বিত বা বানচাল করার জন্য সব ষড়যন্ত্র, বাধা অথবা প্রচেষ্টা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আমাদের গণতন্ত্রপ্রেমী দেশপ্রেমিক জনগণ দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করবে। জনগণের ইচ্ছা জয়ী হবে, কোনও অশুভ শক্তিকে গণতন্ত্রের পথে আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে দেওয়া হবে না।”
গত ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা। দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসা বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দল এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
তবে ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন শর্ত দিয়ে আন্দোলনে নামার হুমকি দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও অভ্যুত্থানকারীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতারা বলছেন, সংস্কার ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচারের বিষয় পাশ কাটিয়ে একটি ‘সাজানো’ নির্বাচন করা হচ্ছে।

বিচার বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত : প্রেস সচিব
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
বাসস জানিয়েছে, শনিবার বিকালে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সচিব বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে আয়োজিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে আজকের সভায় বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের নেতৃত্বে হাইকোর্টের একজন বিচারপতি থাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তদন্ত কমিটি করছে পুলিশ
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, নুরের ওপর হামলার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত করার কথা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জানানোর পর ডিএমপির পক্ষ থেকে এ ঘোষণা এসেছে।
শনিবার বিকালে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “আগামীকাল (রবিবার) ডিএমপির পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।”
কমিটির সদস্য কতজন হবেন, সেখানে কারা থাকবেন কিংবা কত দিনের সময় কমিটিকে দেওয়া হবে, সেসব বিষয়ে রবিবারই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “ওই ঘটনায় পুলিশের কোনও দুর্বলতা ছিল কিনা; কোনও সমস্যা বা গাফলতি ছিল কিনা, কমিটি সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখবে।”
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধসহ ৩ দাবি গণ অধিকার পরিষদের
প্রথম আলো জানিয়েছে, জাতীয় পার্টিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষিদ্ধ করাসহ তিনটি দাবি জানিয়েছে গণ অধিকার পরিষদ। অন্য দাবি দুটি হলো, শনিবারের মধ্যে নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা এবং শুক্রবারের হামলার ঘটনার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে হবে।
শনিবার বিকালে রাজধানী ঢাকার বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে দাবিগুলো তুলে ধরেন গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান।
গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য মাহফুজুর রহমানের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ খান, জনতার অধিকার পার্টির সভাপতি তরিকুল ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন, এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন, পরিষদের সভাপতি নুরুল হকের ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। এর আগপর্যন্ত রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেন। সমাবেশে নুরুলের ওপর হামলার ঘটনা পরিকল্পিত বলে দাবি করা হয়।
সমাবেশে ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে, ‘নুরের ওপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব দে’, ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘জাতীয় পার্টির ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘ওয়ান টু থ্রি ফোর, জাতীয় পার্টি নো মোর’, ‘জাতীয় পার্টির আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
এ সময় রাস্তায় টায়ার পোড়ানো হয়। পরে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি পুরানা পল্টন মোড়, জাতীয় প্রেসক্লাব, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মোড়, বিজয়নগর মোড় হয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়।



