রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনের পথ খুঁজতে আন্তর্জাতিক এক সম্মেলনে অংশ নিতে কক্সবাজারে পৌঁছছেন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
রোহিঙ্গা সঙ্কটের আট বছর পূর্তির মধ্যে তিন দিনব্যাপী এই সংলাপ আয়োজন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। মূলত সেপ্টেম্বরে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তুতির অংশ হিসাবে হচ্ছে এই সংলাপ।
কক্সবাজারে এই সংলাপ চলার মধ্যে মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করে একটি বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে নিপীড়নের মুখে রাখাইনের মুসলমান জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছিল। তবে ২০১৭ সালের আগস্টে এই সঙ্কট বড় আকার নেয়।
মিয়ানমারে সেনাবাহিনী রাখাইনে সামরিক অভিযানের নামে গণহত্যা শুরু করলে ওই বছর কয়েক মাসেই ৭ লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানের কারলেন তখন বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছিল।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন ১৩ লাখের মতো রোহিঙ্গা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাদের অধিকাংশ রয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার শরণার্থী শিবিরে, কিছু আছে নোয়াখালীর ভাসানচরে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো নানা উদ্যোগ নিলেও সফল হয়নি। এরমধ্যে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তা আরও জটিল হয়ে পড়ে।

গত বছর অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস রোহিঙ্গা সঙ্কট অবসানে উদ্যোগী হন।
তার প্রচেষ্টায় গত মার্চ মাসে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস রোহিঙ্গাদের কষ্টগাথা শুনতে বাংলাদেশে আসেন।
সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গা সঙ্কট অবসানে উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা তখনই জানিয়েছিলেন ড. ইউনূস।
সেই আয়োজনের প্রস্তুতি হিসাবে কক্সবাজারে কক্সবাজারে রবিবার শুরু হয় তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সংলাপ। তবে তা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের জন্য সোমবার কক্সবাজার পৌঁছান ড. ইউনূস।
‘স্টেকহোল্ডারস ডায়ালগ : টেকঅ্যাওয়ে টু দ্য হাই-লেভেল কনফারেন্স অন দ্য রোহিঙ্গা সিচুয়েশন’ শীর্ষক এই সংলাপ হোটেল বে ওয়াচে চলছে। তাতে কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ, বৈশ্বিক সংস্থা ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বাসসকে বলেন, মূলত সেপ্টেম্বরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তুতিমূলক ধাপ হিসাবে এই সংলাপ আয়োজন করা হয়েছে।
“এর বিশেষ তাৎপর্য হলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সরাসরি অংশগ্রহণ। তারা এখানে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, হতাশা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার কথা জানাবেন। এই মতামত ও আলোচনা ৩০ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠেয় উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনের আলোচনায় প্রতিফলিত হবে।”
সংলাপে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক অঙ্গনে দৃশ্যমান রাখা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পথ নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
রবিবার সংলাপের প্রথম দিনে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশেষ পর্ব ছিল; যেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আস্থা গড়ে তোলার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম তাতে অংশ নেন।
এই পর্বটি পরিচালনা করেন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি লাকি করিম, মোহাম্মদ রফিক (খিন মৌং) ও ওমর সালমা। বক্তব্য রাখেন সয়েদুল্লাহ, ফুরকান মির্জা, আবদুল্লাহ, হুজ্জাউত উল্লাহ, সহাত জিয়া হিরো, আবদুল আমিন, জাইতুন নারা, জিহিন নূর, আবদুল্লাহ এবং রো মুজিফ খান।

মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত টম অ্যান্ড্রুজ, বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক (ভারপ্রাপ্ত) রানা ফ্লাওয়ারস, ইউএনএইচসিআরের সহকারী হাইকমিশনার রাউফ মাজু এই সংলাপে যোগ দিয়েছেন।
ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংগঠন, সংবাদমাধ্যম, বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও সংলাপে অংশ নিচ্ছেন।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও এই সংলাপে আমন্ত্রিত।
কক্সবাজারে এই সংলাপ শুরুর দিনেই ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে একটি বিবৃতি আসে মিয়ানমার নিয়ে, যেখানে বাংলাদেশের প্রশংসা করা হয়।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখ্য উপ-মুখপাত্র টমি পিগোট সেই বিবৃতিতে বলেন, “বার্মায় (মিয়ানমার) রোহিঙ্গাসহ যেসব আদিবাসী গোষ্ঠী সহিংসতার এবং উচ্ছেদের শিকার, তাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
“বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করছি আমরা, সেই সঙ্গে অন্য দেশগুলোরও, যারা বার্মার শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে।”



