চার বছর আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছিল ঘটা করে। তখন ক্ষমতায় ছিল বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ।
চার বছরের মাথায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দৃশ্যপট যায় পাল্টে। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে শোক পালনে নানা কর্মসূচি আওয়ামী লীগ নিলেও ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ১৫ আগস্ট বাদ পড়ে সরকারি শোক দিবসের তালিকা থেকে।
জনরোষে পড়া আওয়ামী লীগের কোনও কর্মসূচিও দৃশ্যমান ছিল না গত বছরের ১৫ আগস্ট। ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে ফেরেন।
তার ছয় মাসের মাথায় গত ৫ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সেই বাড়ি।
কারণ অভ্যুত্থানকারীদের দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু এবং তার এই বাড়িটি ছিল ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদের প্রতীক’।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ৫০ বছর পূর্ণ হলো শুক্রবার; গতবারের মতো এবারও সরকারি কোনও কর্মসূচি ছিল না।
আওয়ামী লীগের শাসনকালে ৩২ নম্বরের এই বাড়ি ঘিরে শ্রদ্ধা জানানোর ঢল ছিল না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মারধর-হেনস্থার শিকার হন কয়েকজন।
অভ্যুত্থানের পরপরই গত বছরের ১৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে অনেকে জড়ো হয়েছিলেন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে, শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া কাউকে পেলে হেনস্থা করছিলেন তারা।
এবার সেখানে দেখো গেছে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের। তারা আওয়ামী লীগবিরোধী স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি কেউ শ্রদ্ধা জানাতে গেলে তাদের ওপর চড়াও হন। মারধরের শিকারও হন কয়েকজন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সম্প্রতি বলেছিলেন, “১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এটি দুঃখজনক। তবে এ দিনটি আগস্টের অন্য ৩১ দিনের মতোই। কেউ ধানমণ্ডিতে বা কোথাও কর্মসূচি করতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তার সেই নির্দেশনা অনুসরণের কথাই বলেছেন শুক্রবার ৩২ নম্বরে দায়িত্বে থাকা ধানমণ্ডি থানার ওসি ক্যশৈন্যু মারমা।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আপনারা হয়ত লক্ষ্য করে থাকবেন, কিছুদিন আগে আমাদের যে প্রেস সচিব, তিনি কিছু ইন্সট্রাকশন্স দিয়েছিলেন। সেই ইন্সট্রাকশন্স মোতাবেক আমরা কাজ করব।”

স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের এই বাড়িতে ঢুকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে একদল সেনা কর্মকর্তা।
তখন বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। শেখ হাসিনা পরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন।
১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার দেশের সরকারপ্রধান হিসাবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। তারপর টানা দেড় দশক প্রধানমন্ত্রিত্ব করেন, তার সেই শাসনকাল কর্তৃত্ববাদী শাসন হিসাবে চিহ্নিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর জনরোষে পোড়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়, নেতাদের বাড়ি-ঘর। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমেও আসে নিষেধাজ্ঞা। নেতাদের কেউ বিদেশে পালিয়ে, কেউ কারাগারে।
আওয়ামী লীগের বর্তমান ছন্নছাড়া অবস্থার সঙ্গে ১৯৭৫ পরবর্তী অবস্থার মিল খুঁজে পান অনেকেই। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রথম বার্ষিকীও ছিল অনেকটা এবারেরই মতো।
১৯৭৬ সালের সংবাদপত্রগুলোতে স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রথম বার্ষিকীর কোনও খবর ছিল না।
বঙ্গবন্ধুর নিকটজন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকে ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট সংখ্যায় কিছু ছিল না বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে।
তখন ইত্তেফাকের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন মানিক মিয়ার বড় ছেলে মইনুল হোসেন, সম্পাদক ছিলেন ছোট ছেলে আনোয়ার হোসন মঞ্জু।
সেদিন ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় ছিল উপমহাদেশে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও ফাও এর ম্যানিলা ঘোষণা নিয়ে।
মূল খবর ছিল জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন নিয়ে। কলম্বোয় অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সেই সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নেওয়া জিয়াউর রহমানের ৩ কলামের ছবি ছিল প্রথম পাতায়।
জিয়া তখন ছিলেন সেনাপ্রধান ও উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েম।
১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েম ভারতের রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দীন আলী আহমদকে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন, এমন একটি এক কলামের খবর ছিল ইত্তেফাকে।
ঘরোয়া রাজনৈতিক তৎপরতা শিরোনামের একটি কলামে আওয়ামী লীগের ৬ লাইনের একটি খবর ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, “আগামীকাল বিকাল ৪টায় অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি কমিটির এক সভা কমিটির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান চৌধুরীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত হইবে।”
পরদিন ১৬ আগস্টের ইত্তেফাকেও ১৫ আগস্ট সম্পর্কিত কোনও খবর ছিল না। সেদিনের মূল শিরোনামও ছিল জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন নিয়ে। সঙ্গে এক কলামে একটি সংবাদ ছিল জিয়ার সঙ্গে যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট টিটোর বৈঠক নিয়ে।
সেদিন ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় ছিল কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং লেবাননে নৃশংসতা নিয়ে। ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে’ শিরোনামে একটি কলাম ছিল মইনুল হোসেনের, যিনি তার আগের সংসদে আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন।
১৭ আগস্টের ইত্তেফাকে আওয়ামী লীগের বৈঠক হওয়ার খবরটি আসে ঘরোয়া রাজনৈতিক তৎপরতা শীর্ষক সংক্ষিপ্ত খবরে। সেখানে বলা হয়, বৈঠকে একটি বর্ধিত সভা ডাকার সিদ্ধান্ত হয় এবং ১৯৭৪ সালের কাউন্সিলে যোগদানকারীদেরি নামের তালিকা ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর কাছে পাঠাতে জেলা সম্পাদকদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

গণতন্ত্রী পার্টির নেতা আহমদুল কবির সম্পাদিত সংবাদ পত্রিকার ১৫ আগস্টের সংখ্যায়ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বার্ষিকী নিয়ে কোনও প্রতিবেদন ছিল না।
সেদিনের সংবাদের মূল শিরোনাম ছিল জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন নিয়ে, জিয়াউর রহমানের তিন কলামের ছবিসহ।
‘ঘরোয়া রাজনীতি’ শিরোনামের সংক্ষিপ্ত সংবাদে মিজানুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি কমিটির সভা ডাকার ১২ লাইনের একটি খবর ছিল।
ভারতের স্বাধীনতা দিবসে রাষ্ট্রপতি সায়েমের অভিনন্দন বার্তা পাঠানোর এক কলামের একটি প্রতিবেদন ছিল ১৫ আগস্টের সংখ্যায়।
১৫ আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে প্রকাশিত ১৬ আগস্টের সংখ্যায়ও সংবাদের মুল খবর ছিল জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন নিয়ে। সেই প্রতিবেদনের সঙ্গে মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে জিয়ার একটি ছবি চার কলামে ছাপা হয়েছিল।
সরকার মালিকানাধীন পত্রিকা দৈনিক বাংলায় ১৬ আগস্টের সংখ্যায় মূল খবর ছিল জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন নিয়ে। তার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের ছবি ছিল চার কলামে। জিয়া-টিটো বৈঠকের খবর ছিল এক কলামে।
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী লন্ডনে চিকিৎসা চলার খবর ছিল দৈনিক বাংলায়। তার পাশে প্রথম পাতায় তিন কলামের একটি প্রতিবেদন ছিল, যার শিরোনাম ছিল- ‘ফারাক্কা প্রশ্নে ভারত আন্তর্জাতিক কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছে।”
তখন দৈনিক বাংলার সম্পাদক ছিলেন নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী।

মুসলিম লীগ সমর্থক দৈনিক আজাদের ১৫ আগস্টের সংখ্যায়ও মূল খবর ছিল জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন নিয়ে, জিয়ার ছবিসহ।
সেদিনের পত্রিকায় প্রথম পাতায় প্রথম কলামে ছিল আজাদের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীর খবর। ভারতের ‘আজাদী দিবসে প্রেসিডেন্টের বাণী’ শিরোনামে খবরও ছিল।
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম বার্ষিকীতে সেই সম্পর্কিত কোনও খবর আজাদীতেও ছিল না। ‘ঘরোয়া রাজনীতির অঙ্গন’ শিরোনামের সংক্ষিপ্ত সংবাদে আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি কমিটির সভা আহ্বানের আট লাইনের একটি খবর ছিল।
সরকারি মালিকানায় প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ টাইমসের ১৫ আগস্টের সংখ্যায় জিয়ার ছবিসহ জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনই ছিল মুল খবর।
প্রথম পাতায় ভারতের স্বাধীনতা দিবসে রাষ্ট্রপতির অভিনন্দন বার্তা পাঠানোর খবর ছিল।
বাংলাদেশ টাইমসের ১৬ আগস্টের সংখ্যাও ছিল জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনের নানা খবর নিয়ে। মওলানা ভাসানীর লন্ডনে চিকিৎসা নেওয়ার খবর ছিল এদিনের সংখ্যায়।
তখন বাংলাদেশ টাইমসের সম্পাদক ছিলেন এনায়েতুল্লাহ খান, যিনি পরে জিয়ার সরকারে মন্ত্রী হয়েছিলেন। তার ভাই রাশেদ খান মেনন মন্ত্রী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সরকারে।



