এনসিপির কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব দিয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। সেই জবাব সম্বলিত চিঠি প্রকাশ্যেও এনেছেন তিনি। তাতে বলেছেন, কক্সবাজারে ঘুরতে গিয়েছিলেন তিনি, সেই সঙ্গে সাগর পাড়ে বসে গভীরভাবে ভাবতে চেয়েছিলেন অভ্যুত্থান ও দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
দলকে না জানিয়ে কক্সবাজার সফরে যাওয়ার জন্য বুধবারই নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ পাঁচ নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠিয়েছিল অভ্যুত্থানকারীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
মঙ্গলবার তারা কক্সবাজার গিয়েছিলেন। ওই দিনই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন।
সেই আয়োজনে যোগ না দিয়ে অভ্যুত্থানের পাঁচ নেতার এক সঙ্গে কক্সবাজার যাওয়া নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়; তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করতে গিয়েছেন বলে গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে।
সেদিন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছিলেন, এক মাস ধরে জুলাই পদযাত্রা করে তারা ক্লান্ত ছিলেন, তাই ঘুরতে গিয়েছিলেন। আর পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠকের খবরটি পুরোপুরি গুজব।
তবে বুধবার এনসিপির পক্ষ থেকে ওই সফরে যাওয়া মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, দুই মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা ও যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়।
ওই নোটিসে বলা হয়, তারা এই সফরে যাওয়ার কোনও তথ্য দলের রাজনৈতিক পর্ষদকে জানাননি। তাই কক্সবাজারে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণ ও প্রেক্ষাপট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে জানাতে হবে।
বৃহস্পতিবার এই সফরের ব্যাখ্যা সম্বলিত চিঠিটি নিজের ফেইসবুক একাউন্টে পোস্ট করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যা দলের যুগ্ম সদস্য সচিব (দপ্তর) সালাহ উদ্দিন সিফাতের মাধ্যমে আহ্বায়ক নাহিদ ও সদস্য সচিব আখতারকে পাঠানো হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র পাঠের অনুষ্ঠানে না থেকে কক্সবাজার যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে নাসীরুদ্দীন চিঠিতে লিখেছেন, “৫ আগস্ট, ২০২৫ তারিখে আমার কোনও পূর্বনির্ধারিত রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল না। দল থেকেও আমাকে এ সংক্রান্ত কোনও দায়িত্ব বা কর্মপরিকল্পনা জানানো হয়নি।”
৪ আগস্ট রাতে সদস্য সচিব আখতারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তিনি জানতে পারেন যে ৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে দল থেকে তিনজন প্রতিনিধি যাচ্ছেন এবং সেখানে তার কোনও কাজ নেই। তাই তিনি ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কীভাবে কক্সবাজার যাওয়ার পরিকল্পনা হলো, তা তুলে ধরে নাসীরুদ্দীন লিখেছেন, “৪ আগস্ট রাতে দলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ তার কোচিং অফিসের সহকর্মীর ফোন ব্যবহার করে আমাকে জানায় যে সে তার স্কুল বন্ধুদের সঙ্গে দুই দিনের জন্য ঘুরতে যাবে। আমি তাকে আহ্বায়ক মহোদয়কে অবহিত করতে বলি এবং সে জানায় যে বিষয়টি জানাবে, এবং আমাকেও জানাতে বলে যেহেতু তার নিজস্ব ফোন পদযাত্রায় চুরি হয়ে গিয়েছিল। ৪ আগস্ট রাতে পার্টি অফিসে আমি আহ্বায়ক মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানাই।
“আমি কোনো দায়িত্বে না থাকায় এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও মানসিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। সফরসঙ্গী হিসেবে সস্ত্রীক সারজিস আলম ও তাসনিম জারা-খালেদ সাইফুল্লাহ দম্পতি যুক্ত হন।”


এই সময়ে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “আমি ঘুরতে গিয়েছিলাম, তবে এই ঘোরার লক্ষ্য ছিল রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা নিয়ে একান্তে চিন্তা-ভাবনা করা।
“সাগরের পাড়ে বসে আমি গভীরভাবে ভাবতে চেয়েছি গণঅভ্যুত্থান, নাগরিক কমিটি, নাগরিক পার্টির কাঠামো, ভবিষ্যৎ গণপরিষদ এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা নিয়ে।”
এই ঘুরতে যাওয়া কোনও অপরাধ নয় মন্তব্য করে তিনি লিখেছেন, “কারণ ইতিহাস কেবল মিটিংয়ে নয়, অনেক সময় নির্জন চিন্তার ঘরে বা সাগরের পাড়েও জন্ম নেয়।”
পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠকের গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র রয়েছে দাবি করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লিখেছেন, “কক্সবাজার পৌঁছানোর পর হঠাৎ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে আমরা নাকি সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমি তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমকে জানাই যে, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। হোটেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে জানায়, সেখানে পিটার হাস নামে কেউ নেই। পরবর্তীতে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, তিনি তখন ওয়াশিংটনে অবস্থান করছিলেন।
“এই গুজব একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা। অতীতেও আমি এই হোটেলে থেকেছি এবং কখনও কোনও বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি।”
“ঘুরতে আসলে দলের বিধিমালা লঙ্ঘন হয়, এমন কোনও বার্তা আমাকে কখনও দল থেকে দেওয়া হয়নি,” উল্লেখ করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
“পরিস্থিতির আলোকে, আমি মনে করি শোকজ নোটিশটি বাস্তবভিত্তিক নয়। আমার সফর ছিল স্বচ্ছ, সাংগঠনিক নীতিমালাবিরোধী নয় এবং একান্ত ব্যক্তিগত চিন্তা-ভাবনার সুযোগ মাত্র। তবুও দলীয় শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং রাজনৈতিক শালীনতা বজায় রেখে আমি এই লিখিত জবাব প্রদান করছি।”
চাঁদপুরের সন্তান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকার সময় বাম সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনে যুক্ত ছিলেন। ২০২২ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী থেকে বেরিয়ে আসাদের দল এবি পার্টিতে যোগ দেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে নেপথ্যে থেকে তাতে গড়ে তোলায় যুক্ত হন নাসীরুদ্দীন। সেই আন্দোলন অভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটায়।
এরপর অভ্যুত্থানকারীরা যে জাতীয় নাগরিক কমিটি গড়ে তুলেছিল, তার আহ্বায়ক করা হয় নাসীরুদ্দীনকে, সদস্য সচিব হন আখতার। পরে গত ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক দল হিসাবে এনসিপি গঠনের পর মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পান নাসীরুদ্দীন।



