চার বছর পর মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হলো; আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচন করতে একটি অন্তর্বর্তী সরকারও গঠিত হয়েছে; যদিও বেসামরিক এই সরকারেও সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব আগের মতোই থাকছে।
গৃহযুদ্ধ চলার মধ্যে জান্তা সরকারের নির্বাচনের পথে এগিয়ে গেলেও বিরোধী দলগুলো তা প্রত্যাখ্যানই করছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও এর সমালোচনা করছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেতা নোবেলজয়ী অং সান সু চি’র দল নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী। তখন থেকে জরুরি অবস্থা চলছিল।
এর মধ্যে মিয়ানমারে সংঘাত গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। বিরোধী দলগুলো একটি সরকারও গঠন করে, বিভিন্ন রাজ্য থেকে সেনাবাহিনীকে হটিয়ে তার নিয়ন্ত্রণও নেয় বিদ্রোহী বাহিনী।
২০২১ সালের জরুরি অবস্থা জারির ডিক্রি সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে আইনসভা, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগে কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা দিয়েছিল। কিন্তু তিনি এখন সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ হিসাবে নির্বাচনকে বেছে নিচ্ছেন।
জান্তা সরকারের মুখপাত্র জাও মিন তুন বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের পাঠানো এক বার্তায় বলেন, “বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে দেশকে ফেরাতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আজ জরুরি অবস্থা বাতিল করা হয়েছে।”
এদিন রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “আমরা ইতোমধ্যে প্রথম অধ্যায় পার করেছি। এখন দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু করছি।”
রাজধানী নে পি দোতে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন এই ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে এবং সব ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হবে।”
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সরকারি এক ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা প্রদানকারী ডিক্রি বাতিল করা হয়েছে এবং নির্বাচন তদারকির জন্য একটি বিশেষ কমিশনসহ একটি তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসন গঠন করা হয়েছে।
সরকারের মুখপাত্র জাও মিন তুন বলেছেন, “অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপ্রধান এবং কমান্ডার ইন চিফ বলেছেন যে আসন্ন ছয় মাস নির্বাচন প্রস্তুতি এবং আয়োজনের সময়।”
জান্তা সরকার নির্বাচন আয়োজনে বেসামরিক অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা বললেও তার কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। কারণ জেনারেল মিন অং হ্লাইং ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে সব ক্ষমতাই ধরে রেখেছেন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদেও তিনিই থাকছেন।
জান্তা কর্তৃক নির্বাচনের কোনও নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন চলছে এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের প্রশিক্ষণও হচ্ছে।
এ মাসেই জান্তা সরকার ঘোষণা দেয়, ভোট গ্রহণের আগে যে সব বিদ্রোহী অস্ত্র ত্যাগ করবে, তাদের নগদ পুরস্কার দেওয়া হবে।
আবার বুধবার সামরিক সরকার একটি আইন প্রণয়নের কথা জানায়, যে আইনে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টিকারীদের ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

প্রশ্ন অনেক
জান্তা সরকার নির্বাচনের কথা বললেও তা লোক দেখানো হবে বলেই মনে করছে বিরোধী দলগুলো। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদেরও একই মত।
গৃহযুদ্ধ চলতে থাকায় মিয়ানমারের ৫ কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২ কোটি মানুষের তথ্য সংগ্রহই করা যায়নি। ফলে তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি করাটাও কঠিন।
সাবেক আইনপ্রণেতারাসহ বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। তাতে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, দেখা যাবে বিদ্রোহীরা তাদের প্রতিবাদ হিসাবে ভোটকেন্দ্রে আক্রমণ চালাবে।
বিশ্লেষকরা আবার এই নির্বাচনকে জেনারেল হ্লাইংয়ের ক্ষমতায় টিকে থাকার একটি কৌশল হিসাবে দেখছেন। তাদের ধারণা, নির্বাচনের পরেও প্রেসিডেন্ট বা সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসাবে একটি ভূমিকা রাখবেন তিনি। এতে তার ক্ষমতা সুসংহত হবে।
পশ্চিমা দেশগুলোও মিয়নমারের এই নির্বাচনকে জেনারেলদের ক্ষমতা সুদৃঢ় করার একটি কৌশল বলে মনে করছে।
মিয়ানমার গবেষক ডেভিড ম্যাথিসন ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানকে বলেন, ক্ষমতার পরিবর্তনটি কেবল বাহ্যিক এবং যারা ক্ষমতায় রয়েছে, তারা দমননীতি নিয়েই থাকবে।
“তারা কেবল পুনর্বিন্যাস করছে এবং শাসনকে একটি নতুন নাম দিচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে কিছুই পরিবর্তন হবে না। আর এটি এমন একটি নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ, যার সম্পর্কে আমরা খুব বেশি কিছু জানিই না।”
তথ্যসূত্র : রয়টার্স, গার্ডিয়ান



