Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

গোপালগঞ্জ হবে ‘মুজিববাদীমুক্ত’, হামলার পর হুঁশিয়ারি এনসিপির

গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্কে সমাবেশে এনসিপির নেতারা।
গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্কে সমাবেশে এনসিপির নেতারা।
[publishpress_authors_box]

জাতীয় নাগরিক পার্টির জুলাই পদযাত্রা উত্তরাঞ্চল ঘুরে দক্ষিণাঞ্চল হয়ে গোপালগঞ্জে গিয়ে প্রথম বাধার মুখে পড়ল; তা উপেক্ষা করে সমাবেশ করে শেখ হাসিনার জেলাকে ‘মুজিববাদমুক্ত’ করার ঘোষণা দিলেন অভ্যুত্থানের নেতারা।

‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ স্লোগান নিয়ে গত ১ জুলাই শুরু হওয়া এনসিপির পদযাত্রা বুধবার গোপালগঞ্জে পৌঁছার আগেই প্রথমে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরে শহরের পৌর পার্কে এনসিপির সমাবেশস্থলে কয়েকশ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়।

দুপুরে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সেখানে সমাবেশ করে হামলার কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। গোপালগঞ্জকে মুজিববাদীমুক্ত করার ঘোষণা দেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

তবে সমাবেশে শেষে দুপুরের পর শহরের লঞ্চ ঘাট এলাকায় গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সামনে ফের হামলার শিকার হয় এনসিপির গাড়িবহর।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার জেলা গোপালগঞ্জে এইসব হামলার জন্য নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দায়ী করছে পুলিশ ও এনসিপির নেতারা।

গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসাবে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে। পরে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

গোপালগঞ্জে বরাবরই আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান। আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পরও কয়েকদিন গোপালগঞ্জে দলটির নেতা-কর্মীরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত চালিয়ে গিয়েছিল।

জুলাই অভ্যুত্থানের বছর পূর্তিতে এই আন্দোলনের নেতৃত্বদাতাদের গড়া দল এনসিপি সারাদেশ ঘুরে পদযাত্রায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছে।

বরিশাল হয়ে এই পদযাত্রা গোপালগঞ্জে পৌঁছার আগে মঙ্গলবার রাতেই এনসিপির ফেইসবুক পাতায় ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল- “১৬ জুলাই ————– মার্চ টু গোপালগঞ্জ #NCP।”

সেই পদযাত্রা পৌঁছার আগে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উলপুর-দুর্গাপুর সড়কের খাটিয়াগড় চরপাড়ায় পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার খবর আসে সংবাদমাধ্যমে।

এনসিপির পদযাত্রা গোপালগঞ্জ শহরে পৌঁছনোর আগে আগুন দেওয়া হয় পুলিশের একটি গাড়িতে। ছবি : বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

প্রথম আলো জানিয়েছে, এই ঘটনায় পুলিশের তিন সদস্য আহত হন। তারা হলেন সদর উপজেলার গোপীনাথপুর পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক (আইসি) আহমেদ বিশ্বাস, কনস্টেবল কাওছার ও মিনহাজ। তাদের গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পুলিশকে উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, ৪০-৫০ জনের একটি দল পুলিশের গাড়িতে হামলা চালায়, এরপর আগুন ধরিয়ে দেয়।

তারা কারা- এই প্রশ্নে গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মীর মো. সাজেদুর রহমান বিবিসিকে বলেন, “ছাত্রলীগের পোলাপান।”

এরপর বেলা পৌনে ২টার দিকে ২০০ থেকে ৩০০ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে পৌর পার্কে এনসিপির সমাবেশস্থলে হামলা চালায়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময় মঞ্চের আশপাশে থাকা পুলিশ সদস্যরা সেখান থেকে দ্রুত আদালত চত্বরে ঢুকে পড়েন। মঞ্চে ও মঞ্চের সামনে থাকা এনসিপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও দৌড়ে সরে যান।

হামলাকারীরা মঞ্চের চেয়ার ভাংচুর করে, ব্যানার ছিঁড়ে ফেল। একপর্যায়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে আসেন। এ সময় এনসিপির নেতা-কর্মীরা এক হয়ে পুলিশসহ ধাওয়া দিলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।

তারও পরে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা সমাবেশস্থলে উপস্থিত হন। সেখানে বক্তব্য রাখেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ-মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান দিলেও গোপালগঞ্জবাসীর উদ্দেশে শান্তির বার্তা দেন।

সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক ও জুলাই অভ্যুত্থানের নেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা যুুদ্ধের আহ্বান নিয়ে এখানে আসি নাই, আমরা শান্তির আহ্বান নিয়ে এখানে এসেছি। আমরা গোপালগঞ্জের নাম বদলাইতে এখানে আসি নাই। আমরা এখানে এসেছি, গোপালগঞ্জবাসী যেন কোনও বৈষম্যের শিকার না হয়, সেই প্রতিশ্রুতি দিতে।”

তিনি বলেন, “যদি আজকে বাধা না দেওয়া হতো, তাহলে গোপালগঞ্জের সাধারণ জনতা এখানে লোকে লোকারণ্য করে তুলত। গোপালগঞ্জ নামে কোনও বৈষম্য আমরা সহ্য করব না, তেমনি গোপালগঞ্জে কোনও সন্ত্রাসীকেও আমরা সহ্য করব না।”

নাহিদ হামলাকারীদের উদ্দেশে বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের সময় আমরা বলেছিলাম- বাধা দিলে বাধবে লড়াই, সেই লড়াইয়ে জিততে হবে। সেই লড়াইয়ে আমরা জিতেছিলাম। আজ আবারও বাধা দেওয়া হয়েছে। দ্বিগুণ গতিতে তার জবাব আমরা দেব।

“মুজিববাদীরা বাধা দিেয়ছে, তার জবাব দেওয়া হবে। আজ যদি আমরা ঘোষণা দিই, তবে সারা বাংলাদেশ এখানে এসে জড়ো হবে। আজকে কারা বাধা দিয়েছে, কোন সাহসে বাধা দিয়েছে, কোন সাহসে মুজিববাদীরা এখনও গোপালগঞ্জে আশ্রয়ে রয়েছে, কারা আশ্রয় দিয়েছে?”

হামলার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, “দ্রুত সময়ের মধ্যে এর বিচার যদি না হয়, আমরা আবারও আসব গোপালগঞ্জে। বাধা-বিপত্তির পরও আমরা এসেছি, আমরা আবারও আসব। গোপালগঞ্জকে মুজিববাদীদের হাত থেকে মুক্ত করব। মুজিববাদীদের গোপালগঞ্জে আর কোনোদিন দাঁড়া হতে দেব না।”

গোপালগঞ্জবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান রেখে বলেন, “নতুন বাংলাদেশের পক্ষে রয়েছেন, তাদের দায়িত্ব নিতে হবে যেন এই গোপালগঞ্জ আবার মুজিববাদীদের আশ্রয় কেন্দ্র হয়ে উঠতে না পারে।”

গোপালগঞ্জের সমাবেশে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা।

সমাবেশে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “আমাদের এখানে হামলা হয়েছে, পুলিশ নির্বিকার দাঁড়িয়েছিল। এই ড্রামাগুলো আমরা হাসিনার আমলে দেখেছি, সেই ড্রামা আজ এখানে দেখেছি। আমরা বাংলাদেশে আর এই ড্রামা দেখতে চাই না।”

তিনি বলেন, “শেখ পালিয়েছিল পাকিস্তানে, শেখের বেটি পালিয়েছে ভারতে। গোপালগঞ্জবাসীও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। তা হয়েছে শেখের বেটির দ্বারা।

“গোপালগঞ্জ ও বগুড়া এই দুটি জেলাকে দুটি দল ব্যবহার করেছে। আমরা বগুড়ার রাজনীতি করতে চাই না, ফেনীর রাজনীতি করতে চাই না, গোপালগঞ্জের রাজনীতি করতে চাই না, আমরা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে চাই।”

এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ গোপালগঞ্জবাসীর উদ্দেশে বলেন, “হাসিনা আপনাদের ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। তিনি যদি সত্যিই আপানাদের ভালবাসতেন, তাহলে তিনি এখানে আসতেন।

“আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে গোপালগঞ্জকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। আমরা আপনাদের জালিমের শাসন থেকে মুক্ত করেছি। আমরা ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।”

জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “ওরা হামলা করেছে, ওরা ককটেল বিস্ফোরণ করেছে, রাস্তা আটকেছে। কিন্তু গোপালগঞ্জের সাহসী মানুষদের নতুন বাংলাদেশের পদযাত্রা থামিয়ে রাখতে পারে নাই।

“আমরা আপনাদের মতো হিংস্র নই, তবে প্রতিশোধ নিতে আমাদের বাধ্য করবেন না। জনগণ আপনাদের তওবা করার সুযোগ দিয়েছে, তওবা করে বাংলাদেশের মানুষের কাতারে আসুন।”

তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, মুজিববাদ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সঙ্গে মুজিববাদী সংবিধানেরও কবর রচনা করতে হবে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত