সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টিতে ধারবাহিকভাবে ব্যর্থ বাংলাদেশি ব্যাটাররা। অবশেষে সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এলেন লিটন দাস-শামীম হোসেনরা। ফলে ১৭৭ রানের পুঁজি পায় বাংলাদেশ। ব্যাটিংয়ের পর বোলিংয়েও লঙ্কানদের চেপে ধরে বাংলাদেশ। তাতে একশর আগেই অলআউট শ্রীলঙ্কা। এর ফলে ৮৩ রানের জয়ে সিরিজে সমতা ফিরেছে বাংলাদেশ।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০টি টি–টোয়েন্টি খেলে বাংলাদেশের এটি সপ্তম জয়। আর শ্রীলঙ্কার মাটিতে ৮ ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে চারটি। ১–১ সমতায থাকা টি–টোয়েন্টি সিরিজের শেষ ম্যাচ ১৬ জুলাই। কলম্বোর রানাসিংহে প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে অলিখিত ফাইনালে যারা জিতবে, সিরিজ জিতবে তারাই।
এর আগে ছয় ওভার চার উইকেট নেয় বাংলাদেশ। টি টোয়েন্টিতে যে কোনও বোলিং দলের জন্য স্বপ্নের মতো পারফরম্যান্স। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় টি টোয়েন্টিতে তেমন পারফম্যান্স করে দেখাল বাংলাদেশ। ৬ ওভার শেষে ৩৭ রানে ৪ উইকেট তুলে নেয় শ্রীলঙ্কার।
একাদশে পরিবর্তন এনে বেশ সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। শরিফুল ইসলাম শুরুতে এনে দিয়েছেন জোড়া উইকেট। কুশল পেরেরা ও আভিস্কা ফার্নান্ডোকে ০ ও ২ রানে ক্যাচ আউটে নিজের শিকার বানান শরিফুল।
১৫.২ ওভারে ৯৪ রানে অলআউট হয় শ্রীলঙ্কা। লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেনে ১৮ রানে ৩টি, শরিফুল ইসলাম পেয়েছেন ১২ রানে ২ উইকেট। নিশাঙ্কা করেন ২৯ বলে সর্বোচ্চ ৩২ রান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৭৭/৭ (লিটন ৭৬, শামীম ৪৮, হৃদয় ৩১; বিনুরা ৩/৩১)। শ্রীলঙ্কা: ১৫.২ ওভারে ৯৪ (নিশাঙ্কা ৩২, শানাকা ২০; রিশাদ ৩/১৮, শরিফুল ২/১২, সাইফুদ্দিন ২/২১, মোস্তাফিজ ১/১৪, মিরাজ ১/২৬) ফল: বাংলাদেশ ৮৩ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ : লিটন দাস।
লিটন-শামীমের ব্যাটে বাংলাদেশের ১৭৭
লিটন ফিফটি পেলেন আর শামীম ব্যাকরণ ভুলে খেললেন। টি-টোয়েন্টিতে ব্যাকরণ নয়, তার বাইরের ব্যাটিংটাই কার্যকরী বেশি। আর সে সুবাদে বেশ কিছুদিন পর এই ফরম্যাটে বলার মতো স্কোর বোর্ডে জমা করেছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে আগে ব্যাট করতে নেমে ৭ উইকেটে ১৭৭ রান তুলেছে বাংলাদেশ।
সবশেষ এ বছর জুনে পাকিস্তানের বিপক্ষে লাহোরে ৬ উইকেটে ১৯৬ রান করে বাংলাদেশ। এরপর এই ফরম্যাটে ৭ উইকেটে ১৭৭ রান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্কোর। ২৭ বলে ১৭৭ স্ট্রাইকরেটে ৫ চার ও ২ ছক্কায় ৪৮ রান করা শামীমের ইনিংসটি বাংলাদেশকে ভালো স্কোর এনে দেয়। শামীমের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে শেষ ৫ ওভারে ৬২ রান নেয় বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে লিটন ফিফটি করবেন কিনা তা নিয়ে একটু জরিপ হয়ে গেল প্রেস বক্সে। মাত্র একজন লিটনের পক্ষে সায় দেয়। বাকিরা বিপক্ষে। দিন শেষে নিজের জন্য স্বস্তির ফিফটি পেয়েছেন লিটন। শুধু মুখরক্ষা করাই নয়, দলের প্রয়োজনে দারুণ একটি ইনিংস খেলেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
১৩ ইনিংস পর নিজেকে ফিরে পাওয়া ইনিংসে দুবার জীবন পেয়েছেন তিনি। ৩০ ও ৫৮ রানে পাওয়া সুযোগ দুটি কাজে লাগিয়ে ৫০ বলে ৭৬ রানের ইনিংস খেলেছেন ৫ ছক্কা ও ১ চারে। শামীম হোসেন পাটওয়ারীর সঙ্গে মাত্র ৩৯ বলে ৭৭ রানের ঝড়ো জুটি উপহার দিয়েছেন। তাতে অবশ্য ২১ বলে ৩৭ রান করা শামীমের কৃতিত্ব যেমন, লিটনেরও ৩৭ রান ছিল।
এ জুটিতে ১২ থেকে ১৮ ওভারের মধ্যে ৬০ রানের বেশি স্কোরবোর্ডে যোগ করেছে বাংলাদেশ। শামীম ২০২৩ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিলেটে সবশেষ ফিফটি করেছিলেন। এরপর টি-টোয়েন্টিতে এই প্রথম পঞ্চাশ ছাড়ানো স্কোর পেয়েছেন। অবশ্য শামীমের জন্য টানা ফিফটি ছাড়ানো স্কোর করা কঠিন। প্রতিনিয়ত দলের বিপদের সময় নামতে হয় তাকে। চাপ মাথায় নিয়ে রান তোলার চ্যালেঞ্জ থাকে তার। এছাড়াও প্রায় সময়ই শেষ দুই-তিন ওভার থাকতে ক্রিজে যেতে হয় শামীমকে।
সেই হিসেবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে লম্বা সময় ব্যাট করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। আর সেই সুযোগটা দারুণ ভাবে কাজে লাগালেন লিটনের সঙ্গে জুটি গড়ে। শেষ পর্যন্ত ৪৮ রানে রানআউট হন শামীম। লিটন-শামীম জুটিতে ১৭০ ছাড়ানো স্কোর পেল বাংলাদেশ।
১৩ ইনিংস পর লিটনের ফিফটি
একটি ভালো ইনিংস ফর্মে ফেরাতে পারে লিটন দাসকে। দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টির আগে সংবাদ সম্মেলনে সে কথা বলেছিলেন কোচ ফিল সিমন্স। লিটন কোচকে সত্যি প্রমাণ করেছেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে ফিফটি পেয়েছেন তিনি। ছক্কা মেরে ফিফটি পূর্ণ করেন লিটন।
সবশেষ ২০২৪ বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ফিফটি পেয়েছিলেন লিটন। টি-টোয়েন্টিতে এরপর দুটো চল্লিশ ছাড়ানো ইনিংস ছিল এই ব্যাটারের। ওয়ানডেতে ফিফটি এসেছিল আরও আগে, ২০২৩ বিশ্বকাপে। এরপর থেকে সাদা বলে রানের খোঁজে থাকা লিটনের জন্য এই ফিফটি বেশ স্বস্তির।
লিটনের ফিফটি অবশ্য এসেছে একবার জীবন পেয়ে। ৩০ রানে স্ট্যাম্পিং আউট হওয়া থেকে বেঁচে যান তিনি। লিটন আউট হন ৭৬ রানে।
আবারও জোড়া ধাক্কা
থম দুই ওভারের পর দ্রুত উইকেট হারাতে হয়নি। এটা বড় স্বস্তি। কিন্তু ভালো জুটির বিদায়ে জোড়া ধাক্কা হজম করতে হলো বাংলাদেশকে। বিনুরা ফার্নান্ডোর করা ১২তম ওভারে দুটি স্লোয়ারে পরাস্ত হয়েছেন তাওহিদ হৃদয় ও মেহেদি হাসান মিরাজ।
যে জুটির জন্য বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনে সবসময়ই হাহাকার ওঠে, দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারের ব্যাট থেকে সেই জুটি পেয়েছে বাংলাদেশ। লিটন দাস ও তাওহিদ হৃদয় ৬৯ রানের জুটি গড়েছেন। এতে প্রথম দুই ওভারে হারানো ২ উইকেটের পর ১২তম ওভারেও তৃতীয় উইকেট হারিয়েছে বাংলাদেশ।

অধিনায়ক লিটনের সঙ্গে ৬৯ রানের জুটি গড়েছেন হৃদয়। বিনুরা ফার্নান্ডোর অফস্টাম্পের বাইরের স্লোয়ারে কাট করতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন। তার আগ পর্যন্ত সাবলীল খেলছিলেন হৃদয়। ২৫ বলে ৩১ রানের ইনিংস থামে হৃয়ের।
৩০ রানে একবার জীবন পাওয়া লিটন দাস পেয়েছেন ফিফটি। এ নিয়ে ১৩ ম্যাচ পর টি-টোয়েন্টিতে ফিফটি পেলেন লিটন। সর্বশেষ গত বছরের ২৪ জুন তিনি ৫৪* রানের ইনিংস খেলেছিলেন আফগানিস্তানের বিপক্ষে।
প্রথম ম্যাচের চেয়েও বাজে পাওয়ার প্লে বাংলাদেশের
প্রথম টি টোয়েন্টিতে পাওয়ার প্লে তে ১ উইকেটে ৫৪ রান করেছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ম্যাচে তার চেয়েও কম রান যোগ হলো। ৬ ওভার শেষে দুই উইকেট হারিয়ে ৩৯ রান বাংলাদেশের।
শুরুর দুই ওভারে দুই ওপেনারকে হারিয়ে বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। স্বস্তির বিষয় উইকেটে জুটি গড়েছেন লিটন দাস ও তাওহিদ হৃদয়। লিটন ১৫ বলে ১৬ ও হৃদয় ১০ বলে ১৭ রান করেছেন। দুজনের জুটি ৩২ রানেক।
গত ম্যাচে ইনিংসের শুরুতে পারভেজ হোসেন ইমনের ব্যাটেই যা একটু রান এসেছিল বাংলাদেশের। দ্বিতীয় টি টোয়েন্টিতে পারভেজকেই প্রথমে হারাতে হলো বাংলাদেশকে। আগের ম্যাচে ২২ বলে ৩৮ করা ইমন এ ম্যাচে ফিরলেন কোন রান করার আগেই।

এই ধাক্কা সামলে না উঠতেই আবারও উইকেট হারায় বাংলাদেশ। প্রথম ওভারের শেষ বলে ফিরেছিলেন ইমন। দ্বিতীয় ওভারেও শেষ বলে উইকেট হারায় বাংলাদেশ। অফস্টাম্পের বাইরের বলে লুজ শট খেলে উইকেট দিয়ে আসলেন ৮ বলে ৫ রান করা তানজিদ তামিম। দ্বিতীয় টি টোয়েন্টিতে শুরু থেকেই নড়বড়ে ছিলেন তামিম। সেই চাপে পড়ে উইকেট দিয়ে এলেন।
দুই ওপেনারকে হারিয়ে ৩ ওভারে মাত্র ১০ রান ওঠে বাংলাদেশের বোর্ডে। পরের ওভারে দাসুন শানাকার বলে এক ছক্কা ও চারে ১২ রান নিয়ে চাপ কিছুটা কমান তাওহিদ হৃদয়।
দুই ওভারে নেই দুই ওপেনার
প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ৫ ওভারে ৪৬ রানের জুটি গড়েছিলেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার তানজিদ হাসান ও পারভেজ হোসেন ইমন। পরভেজ ৩৮ আর তানজিদ করেছিলেন ১৬। আজ দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে বিবর্ণ দুজনই। প্রথম দুই ওভারেই ফিরে গেছেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার।
থুসারার বলে পারভেজ বোল্ড হন ০ রানে। পা জায়গা থেকে না নড়িয়ে ভুল লাইনে শট খেলে বোল্ড হন তিনি। ৮ বলে ৫ করে তানজিদ ফার্নান্ডোর বলে ক্যাচ দেন পেরেরাকে। ২ ওভারে ৭ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ।
তিন পরিবর্তন নিয়ে সিরিজে টিকে থাকার লড়াইয়ে বাংলাদেশ
প্রথম টি-টোয়েন্টিতে হারের পর সিরিজে টিকে থাকার লড়াই বাংলাদেশের। দিত্বীয় টি টোয়েন্টিতে সে লড়াইয়ে টস হেরে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ পেয়েছে বাংলাদেশ। সিরিজে ফেরার লরাইয়ে একাদশে তিন পরিবর্তন নিয়ে নামছেন লিটন দাসরা।
প্রত্যাশিত ভাবে এবার আর ৮ ব্যাটার নিয়ে নামেনি বাংলাদেশ। বাদ পরেছেন তানজিম সাকিব, তাসকিন আহমেদ ও নাঈম শেখ। তাদের পরিবর্তে দলে ফিরেছেন জাকের আলি, মোস্তাফিজ ও শরিফুল ইসলাম। শ্রীলঙ্কার ডানহাতি ব্যাটারদের আধিক্যের একাদশের পরিবর্তে দুই বাঁহাতি পেসার নিয়ে নামছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা প্রথম ম্যাচের একাদশই রেখেছে।
ডাম্বুলার উইকেট ব্যাটিং সহায়ক তবে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং বিবেচনায় এই উইকেটও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অবশ্য লিটন দাস আশাবাদী। টসে আগে ব্যাট করতে নেমে এ উইকেটে ১৮০-৮৫ পান করার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। যা এক কথায় তাদের জন্য বড় চ্যালেন্জ।
ডাম্বুলায় সবশেষ ম্যাচে জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের সেই ম্যাচটি ছিল ওয়ানডে ফরম্যাটে। ওয়ানডেতে সেই জয়ের রং আজকের ম্যাচে লিটনদের গায়ে লাগে কিনা সেটাই দেখার।
বাংলাদেশ একাদশ: তানজিদ হাসান তামিম, পারভেজ হোসেন ইমন, লিটন দাস (অধিনায়ক ও উইকেটকিপার), তাওহিদ হৃদয়, জাকের আলি, শামীম হোসেন পাটোয়ারি, মেহেদী হাসান মিরাজ, রিশাদ হোসেন, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান, শরিফুল ইসলাম।
শ্রীলঙ্কা একাদশ: পাথুম নিশাঙ্কা, কুশল মেন্ডিস (উইকেটকিপার), কুশল পেরেরা, আভিস্কা ফার্নান্ডো, চারিথ আসালঙ্কা (অধিনায়ক), দাসুন শানাকা, চামিকা করুণারত্নে, জেফরি ভ্যান্ডারসে, মাহিশ থিকশানা, নুয়ান থুসারা, বিনুরা ফার্নান্ডো।



