যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টদের জন্য শুক্রবার এক গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এই রায়ের ফলে নিম্ন আদালতগুলো প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে গেল। অর্থাৎ কার্যত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আরও বাড়ল।
হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হাসিমুখে এই রায়কে “একটি বড় ও অসাধারণ সিদ্ধান্ত” বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রশাসন এই রায়ে “খুবই সন্তুষ্ট”। এটি “সংবিধান, ক্ষমতার বিভাজন ও আইনের শাসনের জন্য এক বিশাল জয়”।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় শুধু ট্রাম্পের জন্মগত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে প্রভাব ফেলবে না। পাশাপাশি এটি তার অন্য অনেক নীতিগত সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পথও প্রশস্ত করবে, যেগুলো এ পর্যন্ত নিম্ন আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশে আটকে ছিল।

জন্মগত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রভাব
সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের জন্মভূমিভিত্তিক নাগরিকত্ব বন্ধের আদেশ কার্যকর করার পথ খুলে দিয়েছে। যদিও এটি সাময়িক। আর এজন্যই হোয়াইট হাউসকে এখন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে, যা সহজ কাজ নয়।
শুক্রবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি এক মাস পরে কার্যকর করার অনুমতি দিয়েছে। একই সঙ্গে, যারা আদালতে মামলা করার অধিকার রাখেন, তাদের প্রভাব সীমিত রাখার সুযোগও রেখেছে আদালত।
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত রাজ্য সরকারগুলো জন্মসনদ ইস্যু করে। অধিকাংশ রাজ্যই শিশুর বাবা-মায়ের নাগরিকত্বের তথ্য লিপিবদ্ধ করে না। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট-শাসিত রাজ্যগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দ্রুত এই রকম কিছু করার পথে আগ্রহী নয়।
এই রায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লেখেন বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট। তিনি তার রায়ে জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারগুলো চাইলে ট্রাম্পের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশের ওপর আরও বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা আরোপের যুক্তি তুলে ধরতে পারে।
আর এতে করে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি লড়াইয়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।
বিচারপতি ব্যারেট লিখেছেন, “রাজ্যগুলোর মতে, নাগরিক নির্ভর ভাতাসমূহ থেকে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি ও প্রশাসনিক জটিলতা কেবলমাত্র নির্বাহী আদেশের পুরোপুরি কার্যকরিতার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রতিকার করা সম্ভব।
“একটি সীমিত পরিসরের নিষেধাজ্ঞা যথাযথ কিনা তা নিম্ন আদালতগুলো যেন নির্ধারণ করে, সেই সিদ্ধান্ত তাদের উপরেই ছেড়ে দেওয়া হলো। তারা এই সংক্রান্ত অন্যান্য যুক্তিও বিবেচনা করতে পারবে।”
শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই রায়কে “একটি বিশাল জয়” বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “জন্মগত নাগরিকত্ব একটি প্রতারণা”। এই রায়ের ফলে এটি “পরোক্ষভাবে কঠিনভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে।” পাশাপাশি তিনি বলেন, এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় প্রতারণা রোধ করবে।
ট্রাম্পের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি শুক্রবার জানান, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগত নাগরিকত্ব থাকবে কি না, তা আগামী অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেবে ।
বাড়ল প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা
নিম্ন আদালতের ফেডারেল বিচারকদের জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতা সীমিত করে দেওয়ার ফলে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের তাৎক্ষণিক ও বিস্তৃত প্রভাব পড়বে।
গণতান্ত্রিক ও প্রজাতন্ত্রী দুই দলই দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, কিছু আদর্শবাদী ফেডারেল বিচারক এককভাবে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত ও কংগ্রেসে পাস হওয়া আইন পর্যন্ত আটকে দিচ্ছেন।
এই মামলার কেন্দ্রে রয়েছে অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের নাগরিকত্ব বন্ধের বিষয়টি। কিন্তু এর বাইরেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত কয়েক মাসে যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেগুলোর অধিকাংশই নিম্ন আদালতের আদেশে আটকে রয়েছে।
ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এমন ২৫টি ঘটনার হিসাব দিয়েছে কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস।
শুক্রবারের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা এখন সঠিকভাবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেইসব নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য এগোতে পারব, যেগুলো এতদিন ভুলভাবে আটকে রাখা হয়েছিল।”
নিম্ন আদালত প্রেসিডেন্টের বিদেশে অনুদান কমানো, বৈচিত্র্যভিত্তিক কর্মসূচি এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার বাজেট হ্রাসের সিদ্ধান্তে বাধা দিয়েছে। তারা সরকারি কর্মচারীদের বরখাস্ত করার ক্ষমতাও সীমিত করেছে। পাশাপাশি অন্যান্য অভিবাসন সংস্কার পরিকল্পনাগুলোও স্থগিত করেছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আনা হোয়াইট হাউসের পরিবর্তনগুলোর কার্যকারিতা স্থগিত করেছে।

মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে প্রশাসন এখন আদালতের কাছে এ ধরনের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের অনুমতি চাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় রক্ষণশীল বিচারকরা ডেমোক্র্যাটদের প্রস্তাবিত পরিবেশগত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে বাধা দেন। তারা ছাত্র ঋণ মওকুফ কর্মসূচি, অভিবাসন আইন সংশোধন ও নিয়মিতীকরণ প্রক্রিয়ার পরিবর্তনেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন।
এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়েও আদালত অবৈধ অভিবাসীদের একটি অংশের জন্য অভিবাসন নিয়ম শিথিলকরণের পরিকল্পনা আটকে দেয় এবং বেশি সংখ্যক হোয়াইট কলার কর্মচারীকে অতিরিক্ত সময়ের মজুরির আওতায় আনার প্রচেষ্টাও রোধ করে। হোয়াইট কলার কর্মচারীরা মূলত মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করেন, শারীরিক শ্রম নয়।
আদালত শেষ পর্যন্ত এসব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে প্রেসিডেন্টের কর্মসূচিগুলো আইনসম্মত ও সংবিধানসম্মত কিনা। আদালতের মতে কোনও কর্মসূচি বেআইনি হলে তারা সেটি স্থগিত করতে পারবে।
সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে বলেছে, “প্রতিটি বাদীর ক্ষেত্রে, নিম্ন আদালতগুলো যেন দ্রুততার সঙ্গে এই রায়ের আলোকে ইনজাংশন বা নিষেধাজ্ঞা জারির নিয়ম মেনে চলে এবং ন্যায়বিচারের নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ থাকে।”
তবে এই পর্যায়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে। অর্থাৎ আপিল আদালত ও সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে ঘটবে। তার আগ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তুলনামূলক বেশি সময় ও সুযোগ পাবেন।
তথ্যসূত্র : বিবিসি


