Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম কি মুছে যাচ্ছে

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভেঙে ফেলা হয় ঢাকার বিজয় সরণীতে থাকা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভেঙে ফেলা হয় ঢাকার বিজয় সরণীতে থাকা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য।
[publishpress_authors_box]

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নতুনভাবে দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয় চার নেতার নাম তালিকায় থাকছে কি না, তা নিয়ে উঠেছে বিতর্ক।

মঙ্গলবার রাতে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধনের অধ্যাদেশ জারির পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতার নাম বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক তা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়েই তালিকায় থাকছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা হয়েছিল, তা সব সরকার আমলেই পড়ে বিতর্কে।

স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করে তালিকা সংস্কারে হাত দেয়। ২০১৬ সালে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারির পর তার আলোকে ২০২২ সালে প্রণীত হয় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ‘ফ্যাসিবাদের প্রতীক’ হিসাবে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার উদ্যোগ নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।

তার ধারাবাহিকতায় গত ১৫ মে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদনের পর মঙ্গলবার রাতে অধ্যাদেশ জারি করে আইনটি সংশোধন হয়।

সংশোধিত আইনে অস্পষ্টতা কোথায়

সংশোধিত আইনে প্রস্তাবায় বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। যেখানে আগে লেখা ছিল- “জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সমুন্নত রাখার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গঠন করবার স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে’ কথাটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

ফলে সংশোধিত আইনে এখন বঙ্গবন্ধু নামটি নেই। ২০২২ সালের আইনের সংজ্ঞায় বঙ্গবন্ধুসহ মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বদাতাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি স্পষ্টভাবে ছিল।

নতুন সংজ্ঞায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে মূলত সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়াই করা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- “যারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে গ্রামে-গঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, এরূপ সকল বেসামরিক নাগরিক এবং সশস্ত্র বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), পুলিশ বাহিনী, মুক্তি বাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) ও উক্ত সরকার কর্তৃক স্বীকৃত অন্যান্য বাহিনী, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স, আনসার সদস্যরা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন।”

এই সংজ্ঞা অনুযায়ী মুজিবনগর সরকারে দায়িত্ব পালনকারীরা বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাচ্ছেন বলে ধরে নেওয়া যায়।

মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে গার্ড অব অনার নেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানে কারাবন্দি বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি। তার অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত বা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলীও ছিলেন মন্ত্রিসভায়।

আগের আইনে স্পষ্ট করে লেখা ছিল- মুক্তিযুদ্ধকালীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অধীনে কর্মকর্তা/কর্মচারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন।

সংশোধিত আইনে ‘প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) ও উক্ত সরকার কর্তৃক স্বীকৃত অন্যান্য বাহিনী, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স, আনসার সদস্যরা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন’ বলা হলেও সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায়ন অস্পষ্টতা তৈরি করেছে।

আগে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা বলে কিছু ছিল না, সংশোধিত আইনে এই শ্রেণীটি যুক্ত করে তার মধ্যে আবার মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে।

সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- “বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে দেশের অভ্যন্তরে বা প্রবাসে অবস্থান করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপিত করা এবং মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করার প্রয়াসে সংগঠকের ভূমিকা পালন, বিশ্বজনমত গঠন, কূটনৈতিক সমর্থন অর্জন এবং মনস্তাত্ত্বিক শক্তি অর্জনের প্রেক্ষাপটে যেসব বাংলাদেশের নাগরিক প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করেছেন।”

সহযোগীদের ৫টি শ্রেণীর মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে রয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অধীন কর্মকর্তা বা কর্মচারী বা দূত এবং ওই সরকারের নিয়োগ করা চিকিৎসক, নার্স বা অন্যান্য সহকারী।

মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সঙ্গে সম্পৃক্ত সব এমএনএ বা এমপিএ; যারা পরে গণপরিষদের সদস্য হয়েছিলেন, তাদেরও সহযোগী শ্রেণীতে রাখা হয়েছে।

আগের আইনে এদের সবাইকে বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, নতুন আইনে এটা স্পষ্ট যে তাদের সেই স্বীকৃতি থাকছে না।

তেমনিভাবে স্বাধীন বাংলা বেতারের সদস্য, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখা সাংবাদিক এবং প্রবাসে থেকে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিরা এখন মুক্তিযোদ্ধার পরিবর্তে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পরিচিত হবেন, এটাও স্পষ্ট করে লেখা আইনে।

বীরাঙ্গনা এবং মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা প্রদানকারী ফিল্ড হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি থাকছে, সেটাও সংশোধিত আইনে স্পষ্ট।

শুধু মুজিবনগর সরকারের কারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন, কারা সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হবেন, তা স্পষ্ট হচ্ছে না।

যা বলছেন ফারুক ই আজম

বীর প্রতীক খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা ফারুক ই আজম উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করার কাজে হাত দেওয়ার পর তার উদ্দেশ্য নিয়ে গত ২৫ মার্চ বাসসকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।

সেখানে তিনি বলেছিলেন, সরকার রণাঙ্গনের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করার কাজ করছে।

উপদেষ্টা ফারুক ই-আজম বীর প্রতীক।

“যেসব কৃষক-শ্রমিক, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, নৌ কমান্ডো, আনসার, ইপিআর যুদ্ধ করেছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তাদের মর্যাদা কখনও সীমান্ত পাড়ি দেওয়া কিংবা বিদেশে বসে আরাম আয়েশে জনমত সৃষ্টির প্রচারণা চালানো, ফুটবল খেলোয়াড়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান গাওয়া মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা এক হতে পারে না।”

তাই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া অন্যান্যদের ‘সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা’ হিসাবে চিহ্নিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেয় বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

তার সেই সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ছিল, রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে যারা যুদ্ধ করেছেন, তাদেরই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার অধ্যাদেশ জারির পর যখন বঙ্গবন্ধুসহ সংগঠকদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি থাকছে না বলে খবর প্রকাশ হয়, তখন ফারুক ই আজমই তা নাকচ করে দেন।

তিনি বুধবার বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমান ও চার নেতাকে অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় রাখা হয়েছে। তারা তো থাকবেনই। তাদের কেন বাদ দেওয়া হবে? মুক্তিযুদ্ধটা তো পরিচালনা করেছেনই তারা।”

এনিয়ে নানা সংবাদমাধ্যম ভুল খবর প্রকাশ করছে অভিযোগ করে ফারুক ই আজম বলেন, “নায্যভাবেই মুক্তিযুদ্ধ ওনারাই পরিচালনা করেছেন। ইতিহাস কেউ কি কেউ কখনও মুছতে পারে? জাতীয় চার নেতাসহ শেখ মুজিবর রহমান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই থাকবে, আছে। তাদেরকে বাদ দেওয়া হয়নি।”

ফারুক ই আজম প্রথম আলোকে বলেছেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই–বাছাই করতে গিয়ে দেখা যায়, মুজিবনগর সরকারের কিছু কর্মচারী ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। এখন থেকে তারা হবেন ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী’।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found