২০০৫ সালের ২৬ মে। ক্রিকেট তীর্থ লর্ডসে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল সদ্য কৈশোর পেরুনো মুশফিকুর রহিমের। আজ ২০২৫ সালের ২৬ মে। টানা ২০ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঙ্গিনায় কাটিয়ে দিলেন বাংলাদেশের এই কিংবদন্তি।
২০ বছর ফর্মের চূড়ায় থেকে খেলতে হলে দরকার সাধনা আর নিরলস পরিশ্রমের। মুশফিকুর রহিম করে গেছেন সেটাই। এজন্যই একবার বলেছিলেন, ‘‘আপনারা যখন ঘুমিয়ে থাকেন আমি তখন মাঠে ঘাম ঝরাই’’। বাংলাদেশে খেলার চেয়ে যেখানে ধুলাই দেখার মানুষ বেশি সেখানে শুধু খেলাকেই আপন করে নিয়েছেন মুশফিক। এজন্য দল মাঠে আসার ঘণ্টা দুয়েক আগে চলে আসেন অনুশীলনে।
সেই ঘাম ঝড়ানো পরিশ্রমের জন্যই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মুশফিকুর রহমি পা রাখলেন ২০ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার মাইলফলকে। বাংলাদেশিদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৮ বছর ১১৯ দিন খেলার রেকর্ড মাশরাফি বিন মর্তুজার (২০০১ সালের ১৮ মে থেকে ২০২০ সালের ৬ মার্চ)। সাকিব আল হাসান আনুষ্ঠানিক অবসর না নিলেও ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর (তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৮ বছর ৫৬ দিন) তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে বলেই ধরে নেওয়া যায়।

বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্যে মুশফিক ছাড়া টানা ২০ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার কীর্তি নেই কারও! এটাই অন্যদের চেয়ে আলাদা করছে তাকে। বিশ্ব ক্রিকেটে ২০ বা এর বেশি ক্রিকেট খেলার নজির হাতে গোনা। সর্বোচ্চ ৩০ বছর ৩১৫ দিন খেলেছেন ইংল্যান্ডের উইলফ্রেড রোডস (১৮৯৯ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত)। অবশ্য তখন শুধু টেস্টই খেলা হত। তিন ফরম্যাটে শচীন টেন্ডুলকার খেলেছেন ২৪ বছর ১ দিন, ক্রিস গেইল ২২ বছর ৫৬ দিন আর শোয়েব মালিক ২২ বছর ৫৬ দিন।
মুশফিকুর রহিম অবশ্য অবসর নিয়েছেন ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি থেকে। সবশেষ টি-টোয়েন্টি খেলেছেন ২০২২ সালে আর ওয়ানডে থেকে অবসর নিয়েছেন এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা তার শেষ ওয়ানডে। এখন থেকে শুধু টেস্টই খেলছেন তিনি। তারপরও অনুশীলনে ধ্যানমগ্ন ঋষি হয়েই থাকেন তিনি। ছুটির দিনেও চলে আসেন মাঠে। বিরক্ত হন থ্রোয়ার আর নিরাপত্তারক্ষীরা। তবে কোনো বিরক্তি আর ক্লান্তি স্পর্শ করে না শুধু মুশফিককেই।

ঘরোয়া ক্রিকেটে অবশ্য খেলে চলেছেন তিন ফরম্যাটে। বিপিএল, ডিপিএল, জাতীয় লিগ, বিসিএলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তিন ফরম্যাট লাগাতার দুই দশক খেলে যাওয়া অবশ্যই কৃতিত্বের। বছরের ১০ মাস খেলার মাঠে থেকে ফিট থাকাটাও বড় ব্যাপার।
মুশফিকুর রহিম টেস্ট খেলেছেন ৯৬টি, ওয়ানডে ২৭৪ আর টি-টোয়েন্টি ১০২টি। আলোঝলমলে ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে করেছেন সর্বোচ্চ ৩টি ডাবল সেঞ্চুরি। ২০১৩ সালের মার্চে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তিটা তার। মুশফিকের তিনটি ডাবল সেঞ্চুরির দুটি উইকেটরক্ষক হিসেবে। টেস্ট ইতিহাসেই উইকেটরক্ষক হিসেবে একটির বেশি ডাবল সেঞ্চুরি নেই কারও। মুশফিক তাই অনন্য। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ১০০ টেস্টের দুয়ারেও তিনি।
মুশফিক ওয়ানডে খেলেছেন ২৭৪টি, যা বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সেরা ২৪৭ ওয়ানডে সাকিব আল হাসান আর তৃতীয় সেরা ২৪৩ ওয়ানডে তামিম ইকবালের। ওয়ানডেতে ৯টি সেঞ্চুরি করলেও মুশফিকের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংস ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে অপরাজিত ৫৬ রান।

পোর্ট অব স্পেনে সেই ম্যাচে ভারতের ১৯১ রান তাড়া করে জিতেছিল বাংলাদেশে, উইনিং শটটা ছিল মুশফিকের। তাতে বিশ্বকাপ থেকে ছুটির ঘণ্টা বেজে যায় টেন্ডুলকার, সৌরভ, দ্রাবিড়দের নিয়ে গড়া দল ভারতের। ২০১৮ এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে মুশফিক আউট হয়েছিলেন ৯৯ রানে। সেঞ্চুরি থেকে ১ রান দূরে থেকে আউট হওয়া একমাত্র বাংলাদেশি মুশফিকই!
২০১২ সালের এশিয়া কাপ ফাইনালে মুশফিকুরের নেতৃত্বে ফাইনালে পৌঁছেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু পাকিস্তানের কাছে ২ রানে হেরে হৃদয় ভাঙে বাংলাদেশের। এই কষ্টটা মুশফিকের ভোলার কথা না। তবে শততম টেস্টে শ্রীলঙ্কাকে হারানো, দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয় সেরা প্রাপ্তি হয়ে থাকবে ক্যারিয়ারে। মিরপুরের মাঠে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে তার রান ৫ হাজার, এক মাঠে এত বেশি রান নেই বিশ্বের আর কোনো ব্যাটারের।

টানা ২০ বছর নিরলস পরিশ্রমে নিজেকে ফিট রেখে মুশফিক যেভাবে ছন্দ ধরে রেখেছেন, এটা নিশ্চিতভাবে তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা। টি-টোয়েন্টির এই অস্থির যুগে মুশফিকের মতো সুস্থির হতে পারলেই পৌঁছানো সম্ভব সাফল্যের চূড়ায়। এজন্য মুশফিক ওয়ানডে ছাড়ার পর নাজমুল হোসেন শান্ত ফেইসবুকে লিখেছিলেন, ‘‘আপনার খেলাটার প্রতি নিবেদন আমাদের জন্য আদর্শ, অনেকগুলো প্রজন্মকেও তা অনুপ্রেরণা জোগাবে।’’



