ফ্রাঙ্কেনস্টাইন সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৩১ সালে। সেই সিনেমায় ড. হেনরি ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের বিজয়ের উল্লাসের দৃশ্যটি ছিল গোটা চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সেই দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল, বজ্রপাত ও শক্তির প্রবল স্রোতের মধ্যে গবেষণাগারের টেবিলে শায়িত দেহটি নড়েচড়ে ওঠে, বিদ্যুতের শক্তিতেই মৃত দেহটি প্রাণ ফিরে পায়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তিও বিদ্যুতের মাধ্যমে ঘটতে পারে; যদিও তা সিনেমার ওই দৃশ্যের মতো অতটা নাটকীয় নয়।
পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর। প্রাণের সবচেয়ে পুরনো প্রমাণিত ফসিল হলো স্ট্রোমাটোলাইট। এটি প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগের। ক্ষুদ্র জীবাণু দিয়ে তৈরি এগুলো স্তরীভূত হয়ে সংরক্ষিত হয়।
কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, প্রাণের যাত্রা এরও আগেও শুরু হতে পারে। প্রাণ গঠিত হতে পারে আদিম জলাশয়ে জমে থাকা জৈব অণু থেকেই। এই মিশ্রণকে কখনও ‘আদিম স্যুপ’ বলা হয়।
কিন্তু এই জৈব উপাদান এল কোথা থেকে? কয়েক দশক আগে গবেষকরা অনুমান করেন, আদিম পৃথিবীর মহাসাগরে বজ্রপাতের ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এ থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে জৈব অণু তৈরি হয়েছিল।
সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে গত ১৪ মার্চ প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, পানির কুয়াশার ক্ষুদ্র চার্জযুক্ত বিন্দুর মধ্যে তৈরি অদৃশ্য ‘সূক্ষ্ম বজ্রপাত’ প্রাণের উপাদান গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
নতুন গবেষণায় একটি পানির বিন্দু (২০০ মাইক্রন ব্যাস) ছোট ছোট ঋণাত্মক চার্জযুক্ত বিন্দুতে ভাগ করা হয়।
এই সূক্ষ্ম বজ্রপাত অজৈব পদার্থ থেকে অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে। অ্যামিনো অ্যাসিড হলো জৈব অণু, যা একত্রিত হয়ে প্রোটিন তৈরি করে। এটি জীবনের মূল কাঠামো ও প্রাণের বিকাশের প্রথম ধাপ।
ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির ভূবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট ড. অ্যামি জে. উইলিয়ামস বলেন, “প্রাণের উৎপত্তির জন্য পৃথিবীর প্রাচীন সময়ে কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো প্রয়োজন ছিল। এর জন্য শক্তিশালী অনুঘটক দরকার ছিল।”
অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরির জন্য নাইট্রোজেন ও কার্বনের মধ্যে বন্ধন তৈরি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু নাইট্রোজেন গ্যাসের শক্তিশালী আণবিক বন্ধন ভাঙতে অনেক শক্তি লাগে। ড. উইলিয়ামসের মতে, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়।
ড. উইলিয়ামস সিএনএনকে এক ইমেইলে জানান, “বজ্রপাত, অথবা এই ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম বজ্রপাত আণবিক বন্ধন ভাঙার ক্ষমতা রাখে। এর ফলে নতুন অণু তৈরি হতে পারে, যা পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”
কুয়াশা ও অতিসূক্ষ্ম বজ্রপাত
পৃথিবীর প্রথম জৈব অণু কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তা বুঝতে গবেষকরা ১৯৫৩ সালের একটি পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে কাজ করেছেন। তখন আমেরিকান রসায়নবিদ স্ট্যানলি মিলার ও হ্যারল্ড ইউরে আদিম পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অনুকরণ করে একটি গ্যাস মিশ্রণ তৈরি করেন।
তারা অ্যামোনিয়া (NH₃), মিথেন (CH₄), হাইড্রোজেন (H₂) ও পানি ব্যবহার করে একটি কাচের গোলকে এই ‘বায়ুমণ্ডল’ তৈরি করেন। এরপর এতে বিদ্যুৎ প্রয়োগ করেন। ফলাফল হিসাবে কার্বন ও নাইট্রোজেনযুক্ত সরল অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি হয়।
এই পরীক্ষা এখন ‘মিলার-ইউরে পরীক্ষা’ নামে পরিচিত। আর এটি অ্যাবায়োজেনেসিস তত্ত্বকে সমর্থন করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জীবন জড় পদার্থ থেকেই সৃষ্টি হতে পারে।
নতুন গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা ১৯৫৩ সালের পরীক্ষাগুলো আবার পর্যালোচনা করেছেন। তবে এবার তাদের লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্রতর স্কেলে বৈদ্যুতিক কার্যক্রম। এই গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ড. রিচার্ড জ্যার এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষক।
জ্যার ও তার সহযোগীরা ১ থেকে ২০ মাইক্রন ব্যাসের পানির কণার মধ্যে বৈদ্যুতিক আদান-প্রদান পর্যবেক্ষণ করেন। (মানুষের চুলের প্রস্থ প্রায় ১০০ মাইক্রন।)

আমেরিকান রসায়নবিদ স্ট্যানলি মিলার মূল পরীক্ষাগার সরঞ্জাম ব্যবহার করে মিলার-ইউরে পরীক্ষা পুনরায় করেন। এই পরীক্ষা বিজ্ঞানী তত্ত্বকে সমর্থন করে যে, জীবন জড় পদার্থ থেকে উদ্ভূত হতে পারে।
জ্যার সিএনএনকে বলেন, “বড় ফোঁটাগুলো ধনাত্মক চার্জযুক্ত। ছোট ফোঁটাগুলো ঋণাত্মক চার্জযুক্ত। যখন বিপরীত চার্জযুক্ত ফোঁটাগুলো কাছাকাছি আসে, তখন ইলেকট্রন ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ফোঁটা থেকে ধনাত্মক চার্জযুক্ত ফোঁটায় লাফিয়ে যেতে পারে।”
গবেষকরা একটি কাচের পাত্রে অ্যামোনিয়া, কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রোজেন মিশিয়ে তার ভেতরে পানির কুয়াশা ছিটিয়ে দেন। এরপর উচ্চগতির ক্যামেরা ব্যবহার করে তারা গ্যাসীয় মিশ্রণে সূক্ষ্ম বজ্রপাতের ক্ষীণ ঝলক ধারণ করেন।
পরীক্ষার পর তারা পাত্রের ভেতরে থাকা উপাদান পরীক্ষা করে দেখেন যে সেখানে কার্বন-নাইট্রোজেন বন্ধনযুক্ত জৈব অণু তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ছিল অ্যামিনো অ্যাসিড গ্লাইসিন এবং ইউরাসিল, যা আরএনএ-এর একটি নিউক্লিওটাইড ভিত্তি।
ড. জ্যার বলেন, “আমরা কোনও নতুন রাসায়নিক বিক্রিয়া আবিষ্কার করিনি। আমরা শুধু ১৯৫৩ সালে মিলার ও ইউরের করা রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো পুনরায় সৃষ্টি করেছি। গবেষণায় নতুন কোনও পদার্থবিদ্যার তত্ত্বও পাওয়া যায়নি। এই পরীক্ষা পরিচিত তড়িৎ-স্থিরবৈদ্যুতিক নীতির ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।
“আমরা প্রথমবার দেখলাম, পানির ক্ষুদ্র বিন্দু তৈরি হলে তা আলো বিকিরণ করে এবং একটি ক্ষুদ্র স্পার্ক (স্ফুলিঙ্গ) তৈরি করে। এটি নতুন বিষয়। আর এই স্পার্ক বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তনের সূচনা করে।”
পানি ও প্রাণ
বজ্রপাত শক্তিশালী বিদ্যুৎ প্রবাহের দৃশ্যমান প্রকাশ হলেও এটি অনিয়মিত ও অনির্দেশ্য। ড. জ্যারের মতে, বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী অস্থির থাকলেও বজ্রপাত খুব বেশি ঘটত না। তাই প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ অ্যামিনো অ্যাসিড উৎপন্ন করার মতো বজ্রপাতের সংখ্যা খুব কম হতে পারে। এ কারণেই অতীতে এই তত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল।
তবে পানির কুয়াশা বজ্রপাতের চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ ঘটনা ছিল। তাই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে যে, পানির কুয়াশা থেকে উৎপন্ন সূক্ষ্ম বজ্রপাত (মাইক্রোলাইটনিং) ছোট জলাশয় ও গর্তে ক্রমাগত অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করত। সেখানে এই অণুগুলো জমা হয়ে ধীরে ধীরে জটিল অণু তৈরি করত, যা পরে জীবনের বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল।

ড. জ্যার বলেন, “চার্জযুক্ত পানির ক্ষুদ্র বিন্দুর মধ্যে ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ (মাইক্রোডিসচার্জ) ঘটে। এটি মিলার-ইউরে পরীক্ষায় দেখা সব জৈব অণু তৈরি করতে পারে। আমরা ধারণা করছি, এটি জীবনের মৌলিক উপাদান তৈরির জন্য একটি নতুন প্রাক-জৈবিক রাসায়নিক প্রক্রিয়া।”
তবে সূক্ষ্ম বজ্রপাত নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেলেও জীবনের উৎপত্তি নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ড. জ্যার।
কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, বিদ্যুৎ শক্তিই জীবনের প্রাথমিক উপাদান তৈরি করেছে। তবে অ্যাবায়োজেনেসিস-এর আরেকটি তত্ত্ব বলছে, পৃথিবীর প্রথম অ্যামিনো অ্যাসিড সাগরের তলদেশে অবস্থিত হাইড্রোথার্মাল রন্ধ্রে (উষ্ণ প্রস্রবণে) তৈরি হয়েছিল।
এই তত্ত্ব অনুসারে, সমুদ্রের পানি, হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ তরল এবং প্রবল চাপের সংযোগে অ্যামিনো অ্যাসিড গঠিত হয়েছিল।
আরেকটি তত্ত্ব বলছে, জৈব অণুগুলি পৃথিবীতে উৎপন্ন হয়নি। বরং সেগুলি মহাকাশে গঠিত হয়েছিল এবং কমেট বা গ্রহাণুর টুকরোর মাধ্যমে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছিল। এই প্রক্রিয়াকে প্যানস্পার্মিয়া বলা হয়।
ড. জ্যার বলেন, “আমরা এখনও এই প্রশ্নের উত্তর জানি না। তবে আমি মনে করি, আমরা এখন অনেক কিছু বুঝতে পারার কাছাকাছি আছি।”
পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তির বিস্তারিত কখনও পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে- এমনটা আশা করেন না ড. উইলিয়ামস। তিনি বলেন, “এই গবেষণা জীবনের উৎপত্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অণু গঠনের আরেকটি সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে। পানি আমাদের পৃথিবীর একটি সর্বব্যাপী উপাদান। এটি পৃথিবীকে মহাকাশ থেকে ‘ব্লু মার্বেল’ নামে বর্ণনা করা হয়। হয়তো পৃথিবীতে জীবন উৎপত্তির ক্ষেত্রে পানি অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে, যা আগে আমরা বুঝতে পারিনি।”
তথ্যসূত্র : সিএনএন



