মাগুরায় ধর্ষণের পর হত্যাচেষ্টার শিকার আট বছরের মেয়েটির সব ছবি অনলাইন থেকে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) অবিলম্বে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলেছে আদালত।
পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন রবিবার আদালতের নজরে আনা হলে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাই কোর্ট বেঞ্চ স্ব-প্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেয়।
শিশুটির প্রতি নির্মমতার ঘটনা নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহসিব হোসাইন। তিনি আদালতে শিশুটির স্বাস্থ্যসুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানান।
এই আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, “আদালত এ বিষয়ে শিশুটির ছবিগুলো অপসারণের জন্য প্রাথমিকভাবে আদেশ দিয়েছেন। আজকেই (রবিবার) বিস্তারিত আদেশের জন্য রাখা হয়েছে।”
পুলিশ ও ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মাগুরার শ্রীপুর উপজেলা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটি বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ির পাশে তাকে রক্তাক্ত অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পরিবারের সদস্যরা প্রথমে মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়।
সেখান থেকে শিশুটিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে শুক্রবার রাতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় শিশুটিকে শুক্রবার রাত ৯টা থেকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসার জন্য শনিবার বিকালে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপতাল থেকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার বিকালে শিশুটির মা বাদী হয়ে চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে মামলা করেছেন। মামলায় শিশুটির ভগ্নিপতি, ভগ্নিপতির ভাই, তার বাবা ও মা- চারজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে মেয়েটির পরিবার।
ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ
ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শনিবার মধ্যরাতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে রবিবারও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন।
রবিবার বেলা ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে অপরাজেয় বাংলার সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তারা সাম্প্রতিক নারী নিপীড়নের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দ্রুত শাস্তি দাবি জানান। রসায়ন, ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। এ সময় তারা ধর্ষণের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দিতে থাকেন। ঢাকার বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রবিবার বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করছেন।
জ্ঞান ফেরেনি মেয়েটির, জানালেন মামা
রবিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, মাগুরার যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুটির অবস্থা অপরিবর্তিত আছে বলে জানিয়েছেন তার মামা। এখনও তার জ্ঞান ফেরেনি। কৃত্রিম উপায়ে চলছে তার শ্বাস-প্রশ্বাস।
শিশুটির মামা আরও জানিয়েছেন, ঢাকা মেডিকেলে শিশুটিকে দেখতে অসংখ্য মানুষ আইসিইউতে ভিড় করায় তার সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এমন অবস্থায় তাকে সিএমএইচ-এ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ওই হাসপাতালেও শিশুটি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছে। তার অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি বলে চিকিৎসকরা তার আত্মীয়দের জানিয়েছেন।
রবিবার তার সর্বশেষ শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়ার কথা রয়েছে। শিশুটির চিকিৎসায় চার সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড কাজ করছে।
মেয়েটিকে দেখতে হাসপাতালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার নির্দেশ
বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

রবিবার সিএমএইচ মাগুরায় নিপীড়নের শিকার শিশুটিকে দেখে আসার পর তিনি সাংবাদিকদের এই কথা বলেন।
হাসপাতাল পরিদর্শনকালে তিনি শিশুটির চিকিৎসার খোঁজ-খবর নেন ও সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
ঘটনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত চার আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। দোষীরা যেন কোনোভাবেই ছাড় না পায়- এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোচ্চার রয়েছে।”
তিনি বলেন, “এ যাবত নারীর প্রতি যত সহিংসতা হয়েছে সেগুলোর তালিকা করে দ্রুত তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্যও বলেছি। ধর্ষণে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “নারীরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে ঘরে-বাইরে দায়িত্ব পালন করবে। এতে যারা তাদের বাধা দিতে আসবে, সহিংসতা করতে আসবে তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।”



