দুই বছর গড়িয়েছে, কিন্তু ঢাকার গুলিস্থানের পাশের সিদ্দিক বাজারের ভবনে বিস্ফোরণে ২৬ জন নিহতের ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।
ফলে কী কারণে এই বিস্ফোরণ ঘটল, তা যেমন জানা যাচ্ছে না। তেমনি যাদের অবহেলা ছিল, তাদের বিচারও শুরু হচ্ছে না।
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২০ বার সময় নিয়েছে বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা। তবে কবে নাগাদ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা যাবে, তা এখনও বলতে পারছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
মামলাটি থানা পুলিশের হাত ঘুরে বর্তমানে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) তদন্ত করছেন।
সর্বশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিলো। কিন্তু সিটিটিসি প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি বলে ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত আগামী ৮ এপ্রিল নতুন তারিখ ঠিক করে দেয়।
কিন্তু সেদিনও প্রতিবেদন দাখিল করতে পারবেন কি না, তা বলতে পারছেন না বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসি’র বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটে কর্মরত পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) এস এম রাইসুল ইসলাম।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিক ভবনের গ্যাসের লাইনকে কমার্শিয়াল থেকে ডোমেস্টিক লাইনে রূপান্তরের জন্য তিতাসের কাছে আবেদন করেছিল। এরপর তা ডোমেস্টিক লাইনে রূপান্তর করা হয়।
“তখন দেড় ইঞ্চি গ্যাসের লাইনের রাইজার খুলে আবার ১.৪ ইঞ্চি গ্যাসের লাইন লাগানোর কথা। কিন্তু আমরা ওখানে (ঘটনাস্থলে) গিয়ে দেখেছি দেড় ইঞ্চি গ্যাসের লাইনই আছে। জাস্ট রিডিউসার দিয়ে গ্যাসের পাইপ ভেতরে গেছে। এটা নিয়ে আসলে তিতাস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা এখনও ফাইলটা দেয়নি। তারা বলেছে, ফাইলটা খুঁজে পাওয়া যাইনি।”
তদন্ত আটকে থাকার জন্য তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতাকে দায়ী করেন তিনি। এবিষয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষের কোনও বক্তব্য সকাল সন্ধ্যা জানতে পারেনি।
তিতাসের সহযোগিতা পেলে তদন্ত শেষ করতে পারবেন আশা প্রকাশ করে পুলিশ পরিদর্শক রাইসুল বলেন, “বিস্ফোরণটা গ্যাসের লাইন থেকেই হয়েছে। এখানে গ্যাসটা কীভাবে জমা হলো, তিতাসের ফাইল পেলে বা তাদের সাথে কথা বলতে পারলে অথবা জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে তদন্তটা আরও একটু বেগবান হতো।”
কোনও ধরনের নাশকতার আলামত পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, “বিস্ফোরণটা গ্যাস থেকেই হয়েছে। এর দায় বিল্ডিং মালিকের, বেজমেন্টে অবস্থিত বাংলাদেশ স্যানিটারি নামক দোকান কর্তৃপক্ষের। তিতাস কর্তৃপক্ষেরও প্রত্যক্ষ নজরদারি বা গাফিলতি আছে।”
তদন্তে যা যা পেয়েছেন, তা তুলে ধরে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “এখানে বিল্ডিং কোড ভায়োলেশন করা হয়েছে। কোনও বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে এয়ার কন্ডিশনড রুম করা যায় না। যেখানে ব্লাস্ট হয়েছে, দেখা গেছে এয়ার কন্ডিশনড রুম ছিল।
“বাড়িওয়ালার মারাত্মক অবহেলা, তার অপরাধ এটা। পুরো আন্ডারগ্রাউন্ডে গ্যাসটা জমে যায়। ফলে বিস্ফোরণ ঘটেছে। সব কিছু মাথায় রেখে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি।”
২০২৩ সালের ৭ মার্চ সিদ্দিক বাজারে বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড কাউন্টারের পাশে কুইনস স্যানেটারি মার্কেট নামে পরিচিত ৭ তলা ওই ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় বিস্ফোরণ ঘটে।
ঘটনার দুদিন পর ৯ মার্চ অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ এনে মামলাটি দায়ের করেন বংশাল থানার এসআই পলাশ সাহা। এরপর ভবনের মালিক দুই ভাই ওয়াহিদুর রহমান ও মতিউর রহমান ও ব্যবসায়ী মিন্টুকে গ্রেপ্তারর দেখিয়ে ৫৪ ধারায় দুই দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। বর্তমানে তারা জামিনে আছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আব্দুল আওয়াল সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ঢাকা শহরের প্রতিটি ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি খুবই ভয়াবহ। সত্যি খুবই দুঃখজনক। সেখানে আমার পরিবার, আপনারও পরিবার থাকতে পারত। একটা প্রাণ চলে গেলে আর ফিরে পাবে না বা কেউ ফিরিয়ে দিতেও পারবে না।”
তবে আসামিদের নির্দোষ দাবি করে তিনি বলেন, “এটা দুর্ঘটনা মাত্র। এই ভবনটি নির্মাণ করেছেন তাদের বাবা। আসামিরা শুধু ভাড়া দিয়েছিল ওপরের ফ্লোরগুলো। যেখান থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে, নিচের সেই ফ্লোরগুলো ভাড়া দেওয়া হয়নি।”
ভবনটির মালিকানায় আরও ১০ জন রয়েছেন জানিয়ে অ্যাডভোকেট আউয়াল বলেন, “৫০ বছর আগে ওই বিল্ডিংয়ে নাকি একটা হোটেল ছিল। তবে সেই হোটেলের গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকলেও পাইপের লাইনটা অক্ষত অবস্থায় ছিল। সেখান থেকে হয়ত বিস্ফোরণ হতে পারে। তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত সত্য ঘটনা কী ঘটেছে, সেটা বলা মুশকিল।
“ভবনটি রাজউকের প্ল্যান অনুযায়ী হয়েছে। রাজউক অনুমোদিত ছিল। এখানে যদি কোনও গাফিলতি থাকে, সেটা রাজউকের। তারা হয়তো সঠিকভাবে মেইনটেনেন্স করেননি। তারা যদি ঠিকঠাক মেইনটেনেন্স করত, তাহলে এই দুর্ঘটনাটি ঘটত না।”